হ্যারি কেনের জোড়া গোলে শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ড

হ্যারি কেনের জোড়া গোলে শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ড
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় অঘটনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ম্যাচের বেশিরভাগ সময় পিছিয়ে থাকা থমাস টুখেলের দল শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক হ্যারি কেনের জোড়া গোলে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে।

ম্যাচের শুরুতেই ব্রায়ান সিপেঙ্গার গোলে এগিয়ে গিয়েছিল আফ্রিকার দেশটি। প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের সামনে ইংল্যান্ড যখন বিদায়ের শঙ্কায় কাঁপছিল, তখনই দলের ত্রাণকর্তা হয়ে আবির্ভূত হন হ্যারি কেন। ম্যাচের ৭৫ ও ৮৬ মিনিটে গোল করে তিনি শুধু দলকে জয়ই এনে দেননি, বরং বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর একটি থেকেও রক্ষা করেছেন।

 

এই জয়ের ফলে শেষ ষোলোতে সহ-আয়োজক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে ইতিহাস গড়া কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের স্বপ্নযাত্রা শেষ হয়ে গেছে।

 

শুরুতেই চমক, এগিয়ে যায় কঙ্গো

ম্যাচের আগে কাগজে-কলমে স্পষ্ট ফেভারিট ছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে কঙ্গো। ম্যাচের ১২ মিনিটে ডান দিক থেকে চ্যান্সেল মবেম্বার ক্রস ডিফেন্সের ভুলে ব্রায়ান সিপেঙ্গার সামনে চলে আসে। আলমেরিয়ার এই উইঙ্গারের নিচু শট গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়।

 

গোলটি নিয়ে পিকফোর্ডের সমালোচনা শুরু হয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইংল্যান্ড গোলরক্ষকের এই বলটি ঠেকানো উচিত ছিল। এই গোলের পর পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মধ্যেও চাপ ও অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

টুখেলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

পানামার বিপক্ষে জয়ী একাদশে দুটি পরিবর্তন আনেন থমাস টুখেল। ডেকলান রাইসকে ফিরিয়ে আনা হয় মিডফিল্ডে এবং ডান প্রান্তে খেলানো হয় জেড স্পেন্সকে। রিস জেমস এবং জ্যারেল কোয়ানসাহ ইনজুরির কারণে বাইরে থাকায় ডান প্রান্তে পর্যাপ্ত বিকল্প না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। কঙ্গোর প্রথম গোলটিও আসে সেই দিক দিয়েই।

 

বিশ্লেষকদের মতে, টুখেলের ২৬ সদস্যের দলে বিশেষজ্ঞ রাইট-ব্যাকের অভাব এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

বেলিংহামের হতাশা ও কোচের সঙ্গে উত্তপ্ত মুহূর্ত

প্রথমার্ধে জুড বেলিংহাম নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না। একটি কঠোর ট্যাকলের জন্য হলুদ কার্ড দেখেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। এরপর কুলিং ব্রেকের সময় তাকে কোচ টুখেলের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে দেখা যায়। তবে ম্যাচের পরে দুজনই বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন।

 

গোলরক্ষক এমপাসির অসাধারণ ম্যাচ

কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি পুরো ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন। ডেকলান রাইসের ক্রস থেকে বেলিংহামের হেড তিনি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন। পরে কর্নার থেকে হ্যারি কেনের হেডও রুখে দেন। মার্কাস রাশফোর্ডের শক্তিশালী শটও গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা।

 

প্রথমার্ধের শেষদিকে বেলিংহামের আরেকটি হেড সেভ করেন এমপাসি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ম্যাচের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে কঙ্গোর এই গোলরক্ষকের প্রশংসা করেছে।

 

কঙ্গোরও ছিল ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ

প্রথমার্ধে শুধু রক্ষণেই নয়, আক্রমণেও ভয়ংকর ছিল কঙ্গো। গ্রুপ পর্বে তিন গোল করা ইয়োয়ানে উইসা ব্যবধান ২-০ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু খুব কাছ থেকে নেওয়া তার শট পোস্টে লেগে বাইরে চলে যায়। যদি সেই বলটি জালে জড়াত, তাহলে ম্যাচের ফল সম্পূর্ণ ভিন্নও হতে পারত।

 

পেনাল্টির দাবি

প্রথমার্ধে একটি ঘটনায় পেনাল্টির জোরালো দাবি তোলে ইংল্যান্ড। হ্যারি কেন গোলরক্ষক এমপাসিকে কাটিয়ে যাওয়ার সময় পড়ে গেলে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা পেনাল্টির আবেদন করেন। কিন্তু রেফারি খেলা চালিয়ে যেতে বলেন। ভিএআরও রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেনি।

 

আক্রমণে ঝুঁকি নেন টুখেল

দ্বিতীয়ার্ধে ধীরে ধীরে চাপে পড়ে ইংল্যান্ড। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চ থেকে একের পর এক আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নামান টুখেল। বুকায়ো সাকা, অ্যান্থনি গর্ডন এবং এবেরেচি এজেকে মাঠে নামানো হয়। এই পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

 

৭৫ মিনিটে কেনের সমতা

ম্যাচের ৭৫ মিনিটে অবশেষে গোলের দেখা পায় ইংল্যান্ড। নতুন বার্সেলোনা খেলোয়াড় অ্যান্থনি গর্ডনের ক্রস থেকে হ্যারি কেন নিচু হেডে বল জালে পাঠান। পুরো ম্যাচে কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে গোল পান ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এই গোলের পর ম্যাচে নতুন প্রাণ ফিরে পায় থ্রি লায়ন্সরা।

 

৮৬ মিনিটে নাটকীয় জয়

ম্যাচের ৮৬ মিনিটে আবারও গর্ডনের অ্যাসিস্ট থেকে গোল করেন কেন। তবে এবার পুরো কাজটি নিজেই করেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। বল পেয়ে শক্তিশালী শটে জালের ছাদে বল জড়িয়ে দেন তিনি। এটি ছিল ইংল্যান্ডের হয়ে কেনের ৮৪তম আন্তর্জাতিক গোল।

 

বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৩-তে। একই সঙ্গে চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন পাঁচ। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও তিনি শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন।

 

কেনের নতুন রেকর্ড

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন অনেক আগেই হয়েছেন হ্যারি কেন। এই ম্যাচের জোড়া গোলের পর তিনি বিশ্বকাপে ১৩ গোলে পৌঁছেছেন। শুধু ইংল্যান্ড নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল স্ট্রাইকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন তিনি।

 

কঙ্গোর রূপকথার সমাপ্তি

৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে অসাধারণ এক গল্প লিখেছিল কঙ্গো। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে তারা কখনও গোল করতে পারেনি, পয়েন্টও পায়নি। কিন্তু এবার তারা শুধু গোলই করেনি, নকআউট পর্বেও জায়গা করে নিয়েছিল। ইয়োয়ানে উইসা, সিপেঙ্গা, ওয়ান-বিসাকা, এমপাসি ও মবেম্বারা পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

 

যদিও শেষ পর্যন্ত তাদের যাত্রা থেমে গেছে, তবুও বিশ্বকাপের অন্যতম চমক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে কঙ্গো।

 

টুখেল ও কেন কী বললেন

ম্যাচ শেষে টমাস টুখেল বলেন, তার দল শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস হারায়নি। তার ভাষায়, কঠিন সময়ে ধৈর্য ও বিশ্বাস ধরে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হ্যারি কেনও কঙ্গোর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কঙ্গো খুব কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল এবং গোলরক্ষক এমপাসি অসাধারণ খেলেছেন। কেন বলেন, নকআউট ফুটবলে ধৈর্য ধরতে হয় এবং এই ধরনের ম্যাচ জিততে লড়াই করতে হয়।

 

সামনে মেক্সিকো

এই জয়ের ফলে শেষ ষোলোতে সহ-আয়োজক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। এস্তাদিও আজতেকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ম্যাচটি ইংল্যান্ডের জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কঙ্গোর বিপক্ষে ইংল্যান্ড যেভাবে খেলেছে, সেই পারফরম্যান্স নিয়ে মেক্সিকোর বিপক্ষে সফল হওয়া কঠিন হবে। তবে হ্যারি কেনের ফর্ম ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আশা।

 

আটলান্টার এই নাটকীয় রাতে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, যখন ইংল্যান্ড সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে পড়ে, তখন হ্যারি কেনই হয়ে ওঠেন তাদের শেষ ভরসা।


সম্পর্কিত নিউজ