বসনিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্র

বসনিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্র
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

স্বাগতিকদের জন্য এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ম্যাচ জিতে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সান্তা ক্লারার লেভিস স্টেডিয়ামে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সময়গুলোর একটি উপহার দিয়েছে মরিসিও পোচেত্তিনোর দল।

ম্যাচের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বুঝিয়ে দেয়, তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। নিজেদের দর্শকদের সামনে শুরু থেকেই বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে তারা। প্রথম ডিহাইড্রেশন ব্রেক পর্যন্ত দুই দলই গোল করতে না পারলেও মাঠের খেলায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য। প্রথম ২৫ মিনিটে প্রায় ৭৮ শতাংশ বলের দখল ছিল স্বাগতিকদের কাছে। ক্রিস্টিয়ান পুলিসিক, মালিক টিলম্যান ও ফোলারিন বালোগান বারবার বসনিয়ার রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করছিলেন।

 

বসনিয়া শুরু থেকেই অপেক্ষা করছিল কাউন্টার অ্যাটাকের। এডিন জেকোকে সামনে রেখে আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগ তাদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। টিম রিম, ক্রিস রিচার্ডস ও সার্জিনো ডেস্ট বেশ সংগঠিত ফুটবল খেলেন পুরো ম্যাচজুড়ে।

 

প্রথমার্ধের বেশিরভাগ সময় বসনিয়ার রক্ষণভাগ দৃঢ়ভাবে লড়াই করলেও বিরতির ঠিক আগে ভেঙে পড়ে তাদের প্রতিরক্ষা। ৪৫তম মিনিটে মালিক টিলম্যানের দেওয়া পাস ডিফেন্ডারদের গায়ে লেগে বক্সের ভেতরে পৌঁছে যায় ফোলারিন বালোগানের কাছে। একা গোলরক্ষক নিকোলা ভাসিলজকে সামনে পেয়ে কোনো ভুল করেননি আর্সেনাল থেকে উঠে আসা এই ফরোয়ার্ড। ঠাণ্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।

 

প্রথমার্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বল দখল ছিল ৬৩ শতাংশ। তারা পাঁচটি শট নেয়, যার কয়েকটি বিপজ্জনক ছিল। অন্যদিকে বসনিয়া পুরো প্রথমার্ধে মাত্র একটি শট নিতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাঝমাঠে ওয়েস্টন ম্যাককেনি ও ইউনুস মুসাহর আধিপত্যই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এনে দেয়।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বসনিয়া কিছুটা আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করে। কোচ সাভো মিলোসেভিচ কয়েকটি পরিবর্তন এনে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোলরক্ষক ম্যাট টার্নারকে খুব বেশি পরীক্ষা নিতে পারেনি তারা।

 

ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে ৬৫ মিনিটে। উঁচু হয়ে আসা বল নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে বসনিয়ার ডিফেন্ডার মুহারোমোভিচের পায়ে বিপজ্জনকভাবে আঘাত করেন বালোগান। প্রথমে রেফারি খেলা চালিয়ে দিলেও পরে ভিএআর পর্যালোচনার জন্য মনিটরে যান। রিপ্লে দেখার পর রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান বালোগানকে।

 

প্রথম গোলের নায়ক বালোগানের বিদায়ে মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রায় ২৫ মিনিটের বেশি সময় একজন কম নিয়ে খেলতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এই সময়টাকে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে একজন কম নিয়েও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে স্বাগতিকরা। বরং দশজনের দল নিয়েও আরও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে দেখা যায় তাদের। বসনিয়া সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। মাঝমাঠে ম্যাককেনি ও মুসাহর পরিশ্রম এবং পুলিসিকের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে স্থির রাখে।

 

ম্যাচের ৮২ মিনিটে আসে নিশ্চিতির গোল। বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল থেকে ফ্রি-কিক পায় যুক্তরাষ্ট্র। দায়িত্ব নেন মালিক টিলম্যান। নিখুঁত শটে তিনি বল জড়িয়ে দেন জালে। বসনিয়ার গোলরক্ষক ভাসিলজ চেষ্টা করেও বল ঠেকাতে পারেননি। এই গোলের পর লেভিস স্টেডিয়ামের প্রায় ৬৮ হাজার দর্শক উৎসবে ফেটে পড়ে।

 

মালিক টিলম্যান ম্যাচ শেষে বলেন, এই জয় পুরো দলের পরিশ্রমের ফল। বিশেষ করে ১০ জন নিয়ে খেলার সময় সতীর্থদের মানসিকতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কোচ মরিসিও পোচেত্তিনো তাঁর দলের শৃঙ্খলা ও মানসিক শক্তির প্রশংসা করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ম্যাচটির পর বিশেষভাবে প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগের। বালোগানের লাল কার্ডের পর প্রায় ২৫ মিনিট একজন কম নিয়েও বসনিয়াকে কার্যত কোনো বড় সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি স্বাগতিকরা।

 

বসনিয়ার জন্য অবশ্য এটি হতাশার বিদায়। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলতে নেমে তারা আক্রমণভাগে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি। পুরো ম্যাচে লক্ষ্যে রাখা শটের সংখ্যাও ছিল খুবই কম। এডিন জেকোকে ঘিরে তৈরি আক্রমণগুলোও বেশিরভাগ সময় ব্যর্থ হয়েছে।

 

এই জয়ের মাধ্যমে ২০০২ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জয়ের স্বাদ পেল যুক্তরাষ্ট্র। সেই আসরে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এবারও সেই স্বপ্ন নতুন করে দেখছেন মার্কিন সমর্থকেরা।

 

শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম, যারা সেনেগালের বিপক্ষে ২–০ ব্যবধান থেকে ফিরে ৩–২ গোলের অবিশ্বাস্য জয় পেয়েছে। আগামী মঙ্গলবার ভোরে মুখোমুখি হবে দুই দল।

 

একদিকে থাকবে স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে বেলজিয়ামের অভিজ্ঞতা ও তারকাবহুল দল। তবে বসনিয়ার বিপক্ষে এই জয় যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বিষয় অন্তত শিখিয়েছে-এই বিশ্বকাপে তারা শুধু আয়োজক নয়, বরং সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে প্রস্তুত।


সম্পর্কিত নিউজ