{{ news.section.title }}
ইকুয়েডরকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিলো মেক্সিকো
মেক্সিকোর বিশ্বকাপ যাত্রা যেন দিন যত যাচ্ছে, ততই আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। গ্রুপ পর্বে টানা তিন জয়ের পর এবার নকআউট পর্বেও নিজেদের দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রাখল সহ-আয়োজক দেশটি। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে হাভিয়ের আগুইরের দল।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই ঘরের মাঠে খেলার বাড়তি সুবিধাকে বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল মেক্সিকোর জন্য। কিন্তু এখন বিষয়টি শুধু দর্শক সমর্থন বা মাঠের পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাঠের খেলাতেও তারা দেখাচ্ছে অসাধারণ সংগঠন, শক্তিশালী রক্ষণ এবং কার্যকর আক্রমণভাগ। চার ম্যাচ শেষে এখন পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি এল ত্রি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি তাদের অন্যতম সেরা সূচনা।
ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগেই একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মেক্সিকো সিটিতে বৈরী আবহাওয়া এবং বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পরে ম্যাচ শুরু হয়। তবে দর্শকদের উদ্দীপনায় কোনো ভাটা পড়েনি। আজতেকার গ্যালারি শুরু থেকেই পরিণত হয়েছিল সবুজ সমুদ্রে।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে মেক্সিকো। জুলিয়ান কুইনোনেস, রাউল হিমেনেজ, রবার্তো আলভারাদো ও তরুণ মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরাকে নিয়ে আক্রমণে একের পর এক চাপ সৃষ্টি করে তারা। বিশেষ করে মাত্র ১৭ বছর বয়সী মোরার পারফরম্যান্স মেক্সিকান সমর্থকদের নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর পরিণত ফুটবলেরও প্রশংসা করেছে।
২২ মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম গোল। মাঝমাঠে বল কেড়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠে মেক্সিকো। বাঁ দিক দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে গিয়ে বক্সে ঢুকে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে জোরালো শটে বল জালে পাঠান জুলিয়ান কুইনোনেস। গ্যালারিতে তখন শুরু হয়ে যায় উৎসব।
কুইনোনেস শুধু গোলই করেননি, পুরো ম্যাচে ছিলেন মেক্সিকোর সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের একজন। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা ইকুয়েডরের রক্ষণকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে।
৩১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে মেক্সিকো। কুইনোনেসের তৈরি করা আক্রমণ থেকে বল পান রাউল হিমেনেজ। অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকার ঠাণ্ডা মাথায় শট নিয়ে ইকুয়েডরের গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন। দুই গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় মেক্সিকো।
প্রথমার্ধে ইকুয়েডর কার্যত ম্যাচেই ফিরতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকার দলটি বলের দখল রাখতে চাইলেও মেক্সিকোর মিডফিল্ড প্রেসিং এবং রক্ষণভাগের সংগঠিত ফুটবলের সামনে তারা অসহায় ছিল। প্রথম ৪৫ মিনিটে তারা তেমন কোনো পরিষ্কার সুযোগও তৈরি করতে পারেনি।
বিরতির পর অবশ্য বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ইকুয়েডর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ময়সেস কাইসেদো, এনার ভ্যালেন্সিয়া, জন ইয়েবোয়া ও গঞ্জালো প্লাতারা আক্রমণে গতি আনার চেষ্টা করেন। বলের দখলেও এগিয়ে যায় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। কিন্তু মেক্সিকোর রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ।
৭৫ মিনিটে ইকুয়েডর ম্যাচে ফেরার বড় সুযোগ পায়। আক্রমণভাগের খেলোয়াড় রদ্রিগেজ গোলরক্ষকের মুখোমুখি হয়েও বল পোস্টের বাইরে পাঠান। সেটিই ছিল তাদের সেরা সুযোগগুলোর একটি। অন্যদিকে মেক্সিকো পাল্টা আক্রমণে আরও কয়েকবার গোলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
ম্যাচের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায় ইকুয়েডরের জন্য। যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে ডিফেন্ডার পিয়েরো হিনকাপিয়ে লাল কার্ড দেখেন। প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং আচরণের কারণে রেফারি তাঁকে মাঠ থেকে বের করে দেন। ফলে শেষ মুহূর্তে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইকুয়েডর।
এই পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়ে গেল ইকুয়েডরের বিশ্বকাপ অভিযান। গ্রুপ পর্বে জার্মানিকে হারিয়ে চমক দেখানো দলটি নকআউট পর্বে এসে আর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। আক্রমণে ধারহীনতা এবং প্রথমার্ধের দুর্বল পারফরম্যান্সই তাদের বিদায়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে মেক্সিকো এখন টানা চার ম্যাচ জিতে শেষ ষোলোতে উঠেছে। আরও বড় বিষয় হলো, চার ম্যাচে এখনো একটি গোলও হজম করেনি তারা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ইতালির ১৯৯০ সালের দলের পর প্রথম চার ম্যাচে গোল না খেয়ে জয়ের নজির গড়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে মেক্সিকো।
কোচ হাভিয়ের আগুইরের দল এখন শুধু ভালো খেলছেই না, তারা নিজেদের সামর্থ্যেরও স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। অভিজ্ঞ রাউল হিমেনেজ, দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কুইনোনেস, তরুণ মোরা এবং শক্তিশালী রক্ষণভাগ নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম আলোচিত দলে পরিণত হয়েছে মেক্সিকো।
বিশ্বকাপে দীর্ঘদিন ধরে থাকা ‘পঞ্চম ম্যাচের অভিশাপ’ ভাঙার স্বপ্নও আবার জোরালো হয়েছে। কারণ শেষ ১৬ নিশ্চিত করার পর এখন তাদের সামনে আরও বড় লক্ষ্য অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণেও এখন মেক্সিকোকে সম্ভাব্য ডার্ক হর্স হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আজতেকার গ্যালারিতে শেষ বাঁশি বাজার পর যে দৃশ্য দেখা গেল, সেটি শুধু একটি জয়ের উদযাপন নয়; বরং বহু বছরের অপেক্ষা, আশা এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন। সহ-আয়োজক দেশটি এখন প্রমাণ করছে, তারা শুধু বিশ্বকাপ আয়োজন করতেই আসেনি, বরং শিরোপার লড়াইটাও দীর্ঘ করতে চায়।