{{ news.section.title }}
'হারানোর কিছু নেই' সুইডেনকে নিয়ে সতর্ক ফ্রান্স
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হতেই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে অঘটনের মিছিল। দ্বিতীয় দিনেই বিদায় নিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল নেদারল্যান্ডস। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে ও মরক্কোর মতো দল জায়গা করে নিয়েছে শেষ ষোলোয়। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সুইডেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স।
বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ৩টায় শুরু হবে ম্যাচটি। কাগজে-কলমে ফ্রান্স স্পষ্ট ফেবারিট হলেও ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম বারবার সতর্ক করছেন তাঁর দলকে। কারণ বিশ্বকাপের এই নকআউট পর্ব ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, নাম কিংবা ইতিহাস দিয়ে কোনো ম্যাচ জেতা যায় না।
ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে দেশম বলেন, “সুইডেনের হারানোর কিছু নেই। তারা কোনো চাপ নিয়ে খেলতে নামছে না। আমাদের বিনয়ী থাকতে হবে, মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। গ্রুপ পর্বে ভুল করার সুযোগ ছিল, কিন্তু এখন আর দ্বিতীয় কোনো সুযোগ নেই।”
ফ্রান্স এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অন্যতম সেরা দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক এবং নরওয়েকে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। তিন ম্যাচে ১০ গোল করেছে লেস ব্লুজরা, যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলসংখ্যার মধ্যে একটি। কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং দেজিরে দুয়ের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষ রক্ষণে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে দেম্বেলের হ্যাটট্রিক পুরো বিশ্বকাপে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেই ম্যাচে ৪–১ গোলের বড় জয় ফ্রান্সকে শুধু গ্রুপসেরা করেনি, তাদের শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবেও আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে।
তবে দেশমের জন্য গত সপ্তাহটি সহজ ছিল না। নিজের মায়ের মৃত্যুতে তাঁকে ফ্রান্স ছেড়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন না। শেষকৃত্য শেষে শনিবার তিনি আবার দলের ক্যাম্পে যোগ দেন। সংবাদ সম্মেলনে দেশম বলেন, দলের খেলোয়াড়দের সমর্থন তাঁকে কঠিন সময় পার করতে সাহায্য করেছে।
২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ বিশ্বকাপের রানার্সআপ ফ্রান্স এবারও অন্যতম বড় ফেভারিট হিসেবেই টুর্নামেন্টে এসেছে। তবে দেশম মনে করিয়ে দিয়েছেন, নকআউট পর্বে সব হিসাব নতুন করে শুরু হয়।
তিনি বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু এখন সবকিছু আবার শূন্য থেকে শুরু হচ্ছে। এখন প্রতিপক্ষের মান আরও বেড়ে যাবে।”
অন্যদিকে সুইডেনের বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল বেশ নাটকীয়। বাছাইপর্বে নিজেদের গ্রুপে হতাশাজনক পারফরম্যান্স করলেও নেশন্স লিগের ফলাফলের কারণে প্লে-অফের সুযোগ পায় তারা। পরে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জায়গা করে নেয় বিশ্বকাপে।
গ্রুপ পর্বে তাদের শুরু ছিল দুর্দান্ত। তিউনিসিয়াকে ৫–১ গোলে উড়িয়ে দেয় সুইডিশরা। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের কাছে একই ব্যবধানে হেরে বড় ধাক্কা খায় দলটি। শেষ ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ১–১ গোলের ড্র করে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটে উঠে আসে তারা।
জাপানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে অ্যান্থনি এলাঙ্গার সমতাসূচক গোল সুইডেনকে বাঁচিয়ে দেয়। মজার বিষয় হলো, ম্যাচ শেষে এলাঙ্গা ভেবেছিলেন দলটি বাদ পড়ে গেছে। পরে তিনি জানতে পারেন, সেই ড্রই সুইডেনকে শেষ ৩২-এ তুলে দিয়েছে।
সুইডেন কোচ গ্রাহাম পটার অবশ্য তাঁর দলকে নিয়ে বাস্তববাদী। তিনি স্বীকার করেছেন, ফ্রান্সকে হারাতে হলে তাঁর দলকে জীবনের সেরা ম্যাচ খেলতে হবে।
পটার বলেন, “ফ্রান্সের দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। তারা বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটি। আমাদের প্রায় নিখুঁত ফুটবল খেলতে হবে।”
সুইডেনের সবচেয়ে বড় ভরসা ভিক্টর জিওকেরেস, আলেকজান্ডার ইসাক এবং অ্যান্থনি এলাঙ্গা। দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ এবং সেট-পিসে তারা বিপজ্জনক হতে পারে। তবে তাদের রক্ষণভাগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে সাত গোল হজম করেছে সুইডিশরা। অন্যদিকে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়ংকরদের একটি।
ফ্রান্সের স্কোয়াডেও কিছু দুশ্চিন্তা রয়েছে। মার্কাস থুরাম চোটের কারণে খেলতে পারবেন না। এন’গোলো কান্তের ফিটনেস নিয়েও কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। তবে উইলিয়াম সালিবা দলে ফিরতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতিহাসও ফ্রান্সের পক্ষেই কথা বলছে। দুই দেশের আগের ২৩ দেখায় ১২টিতে জিতেছে ফ্রান্স, ছয়বার জিতেছে সুইডেন এবং পাঁচটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে এবারই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ম্যাচটি এখন শুধু ফ্রান্সের শক্তি আর সুইডেনের সাহসের লড়াই নয়। এটি এমন একটি ম্যাচ, যেখানে একদিকে রয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে রয়েছে হারানোর কিছু না থাকা একটি দলের স্বপ্ন।
জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিদায়ের পর দেশমের সতর্কবার্তার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ এই বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, ফেবারিটের তকমা কোনো নিশ্চয়তা নয়। আর সুইডেন যদি আবারও চমক দেখাতে পারে, তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপের অঘটনের তালিকায় আরও একটি বড় নাম যোগ হবে।