টাইব্রেকারে জার্মানিকে বিদায় করে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে

টাইব্রেকারে জার্মানিকে বিদায় করে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেল এমন এক রাতে, যেটি হয়তো দীর্ঘদিন ধরে মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব। বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে প্রায় দুই ঘণ্টার লড়াই, অতিরিক্ত সময়ের নাটক, বাতিল হওয়া গোল এবং টাইব্রেকারের উত্তেজনার শেষে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২ থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে জার্মানদের। ১–১ সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচে টাইব্রেকারে ৪–৩ গোলের জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।

বিশ্বকাপের এবারের আসরে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অঘটন। কারণ টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই জার্মানিকে অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের সবকটিতে জয় পেয়ে আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় নকআউটে উঠেছিল জুলিয়ান নাগেলসমানের দল। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে শেষ মুহূর্তে নকআউট নিশ্চিত করেছিল এবং অনেক বিশ্লেষকই ম্যাচের আগে জার্মানিকেই পরিষ্কার ফেবারিট হিসেবে দেখেছিলেন।

 

কিন্তু নকআউট ফুটবলে পরিসংখ্যান কিংবা অতীতের সাফল্য অনেক সময় অর্থহীন হয়ে পড়ে। বোস্টনের রাত সেটিরই আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকল।

 

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখলে ছিল জার্মানি। কিমিখ, ভির্টৎস, মুসিয়ালা এবং হাভার্টজদের সমন্বয়ে জার্মান আক্রমণভাগ একের পর এক আক্রমণ তৈরি করলেও প্যারাগুয়ের রক্ষণ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। বিশেষ করে গোলরক্ষক অরলান্দো হিল প্রথমার্ধ থেকেই অসাধারণ সব সেভ করে জার্মানদের হতাশ করতে থাকেন।

 

প্রথম ২০ মিনিটেই কাই হাভার্টজ ও ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস দুটি ভালো সুযোগ নষ্ট করেন। মুসিয়ালার নেওয়া একটি নিচু শটও দক্ষতার সঙ্গে ঠেকিয়ে দেন হিল। জার্মানদের ধারাবাহিক আক্রমণের মধ্যেও ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নেয় প্যারাগুয়ে।

 

৪২ মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম বড় মুহূর্ত। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত আক্রমণে উঠে আসে প্যারাগুয়ে। ডান প্রান্ত থেকে আসা আক্রমণে বল পেয়ে হুলিও এনসিসো জার্মান ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে নিচু শটে বল পাঠিয়ে দেন ম্যানুয়েল ন্যয়ারের জালে। পুরো স্টেডিয়াম তখন স্তব্ধ। প্যারাগুয়ে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

 

গোল হজম করার পর জার্মানি কিছুটা চাপে পড়ে যায়। প্রথমার্ধ শেষ হয় দক্ষিণ আমেরিকার দলটির লিড নিয়েই।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে জার্মানি। ৫৪ মিনিটে অবশেষে সমতায় ফেরে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ডান দিক থেকে আসা ক্রসে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করেন কাই হাভার্টজ। গোলের পর জার্মান সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়।

 

সমতা ফেরার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় জার্মানি। মুসিয়ালা, ভির্টৎস এবং সানের আক্রমণে বারবার চাপে পড়ে প্যারাগুয়ে। কিন্তু প্রতিবারই সামনে এসে দাঁড়ান গোলরক্ষক অরলান্দো হিল।

 

বিশেষ করে ৭২ মিনিটে লিরয় সানের কাছ থেকে নিশ্চিত একটি গোল বাঁচিয়ে দেন তিনি। পরে ভির্টৎসের দূরপাল্লার শটও দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন প্যারাগুয়ের এই গোলরক্ষক। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো দল গোল করতে না পারলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

 

অতিরিক্ত সময়েও জার্মানির চাপ অব্যাহত ছিল। ১০৮ মিনিটে মনে হচ্ছিল ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে গেছে। কর্নার থেকে আসা বলে জনাথন টাহ হেড করে বল জালে জড়ান। জার্মান খেলোয়াড়রা উদযাপনও শুরু করে দেন। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনার পর দেখা যায়, গোলের আগে ভালডেমার আন্টন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষককে ধাক্কা দিয়েছেন। ফলে ফাউলের কারণে গোল বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তে জার্মান খেলোয়াড়রা হতাশ হয়ে পড়েন।

 

১২০ মিনিটের খেলা শেষে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে চারবার টাইব্রেকারে অংশ নিয়ে প্রতিবারই জয় পেয়েছিল জার্মানি। ফলে ইতিহাসও ছিল তাদের পক্ষে। কিন্তু সেই রেকর্ডও ভেঙে যায় বোস্টনের রাতে।

 

প্রথম শট নিতে আসেন কাই হাভার্টজ। কিন্তু তাঁর শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন অরলান্দো হিল। এরপর জার্মানির হয়ে কিমিখ এবং মুসিয়ালা গোল করলেও চতুর্থ শটে ভোল্টেমাডের প্রচেষ্টাও রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক।

 

অন্যদিকে প্যারাগুয়ে প্রথম তিনটি শট সফলভাবে জালে পাঠায়। তবে তাদের চতুর্থ শট বাইরে চলে যায় এবং পঞ্চম শট ম্যানুয়েল ন্যয়ার ঠেকিয়ে দিলে স্কোর ৩–৩ সমতায় পৌঁছে যায়।

 

এরপর শুরু হয় সাডেন ডেথ।

জার্মানির জনাথন টাহ চাপের মুহূর্তে শট নিতে গিয়ে বল উড়িয়ে মারেন। এরপর প্যারাগুয়ের হোসে কানালে এগিয়ে আসেন। শান্তভাবে নেওয়া তাঁর শট ন্যয়ারকে পরাস্ত করে জালে জড়ালে উল্লাসে ফেটে পড়ে প্যারাগুয়ের খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা।

 

ম্যাচের সবচেয়ে বড় নায়ক নিঃসন্দেহে গোলরক্ষক অরলান্দো হিল। পুরো ম্যাচে তিনি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন এবং টাইব্রেকারে জার্মানির দুটি শট ঠেকিয়ে দেন। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সই প্যারাগুয়েকে এনে দিয়েছে ঐতিহাসিক এই জয়।

 

২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর জার্মানির জন্য বিশ্বকাপ যেন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ ও ২০২২ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। এবার অন্তত নকআউটে উঠলেও প্রথম ম্যাচেই থেমে গেল তাদের যাত্রা।

 

অন্যদিকে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আবারও নিজেদের পুরোনো শক্তির পরিচয় দিল প্যারাগুয়ে। ২০১০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা দলটি এবারও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ফ্রান্স ও সুইডেন ম্যাচের বিজয়ী দল।

 

বোস্টনের এই রাত তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচের গল্প নয়। এটি বিশ্বকাপের সেই পুরোনো সত্যটাকেই আবার মনে করিয়ে দিল-এখানে নাম, ইতিহাস কিংবা ট্রফির সংখ্যা নয়, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ৯০ মিনিট, ১২০ মিনিট কিংবা কখনো কখনো মাত্র একটি পেনাল্টি শট। আর সেই পরীক্ষায় এবার জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিল প্যারাগুয়ে।


সম্পর্কিত নিউজ