শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিলের রুদ্ধশ্বাস জয়

শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিলের রুদ্ধশ্বাস জয়
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইতিহাস খুব কমই মনে রাখে কে কতক্ষণ ভালো খেলেছিল। শেষ পর্যন্ত মনে থাকে কে জিতল, কে টিকে থাকল আর কে ঘরে ফিরল। হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে সোমবার রাতে ব্রাজিল ও জাপানের মধ্যকার রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচটিও ঠিক তেমনই এক গল্প লিখে রাখল। ৯০ মিনিটের লড়াই, যোগ করা সময়ের নাটক আর গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির শেষ মুহূর্তের গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই হিউস্টনের গ্যালারি পরিণত হয় এক বিশাল হলুদ উৎসবে। প্রায় ৬৮ হাজারের বেশি দর্শকের উপস্থিতিতে স্টেডিয়ামজুড়ে তখন শুধু ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাস। কার্লো আনচেলত্তি দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মাঠের মাঝখানে সতীর্থদের মাঝে হারিয়ে গেছেন ম্যাচের নায়ক গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি।

 

কিন্তু এই জয় মোটেও সহজে আসেনি।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল ব্রাজিলের কাছে। তবে দখল থাকলেও আক্রমণে ছিল না গতি কিংবা সৃজনশীলতা। জাপানের সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত প্রেসিং এবং মাঝমাঠে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল বারবার সমস্যায় ফেলেছে সেলেসাওদের।

 

প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে অনেকটাই অগোছালো দেখিয়েছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, লুকাস পাকেতা ও মাতেউস কুনিয়ার মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঝেমধ্যে নিজেদের খেলোয়াড়দের মধ্যেই ভুল বোঝাবুঝি দেখা গেছে। ব্রুনো গিমারাইসের একটি পাস গিয়ে লাগে পাকেতার মুখে। এক পর্যায়ে ভিনিসিয়ুসকে ক্ষোভও প্রকাশ করতে দেখা যায়।

 

প্রথম ২৫ মিনিটে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে মাতেউস কুনিয়ার পায়ে। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর শট সহজেই আটকে দেন জাপানের গোলরক্ষক জিওন সুজুকি। অন্যদিকে জাপান ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের ছন্দ খুঁজে নেয়। তাদের দ্রুত পাল্টা আক্রমণ ব্রাজিলের রক্ষণকে কয়েকবার অস্বস্তিতে ফেলে।

 

ম্যাচের ২৯ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত। মাঝমাঠে দানিলোর কাছ থেকে বল কেড়ে নেন কাইশু সানো। সামনে কাসেমিরো থাকলেও তাঁকে কাটিয়ে এগিয়ে যান জাপানি মিডফিল্ডার। এরপর দূরপাল্লার নিচু শটে আলিসনকে পরাস্ত করে জাপানকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।

 

জাতীয় দলের হয়ে এটি ছিল কাইশু সানোর প্রথম গোল। আর সেটি এলো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে। গোলের পর জাপানের সমর্থকদের উল্লাসে মুহূর্তের জন্য হিউস্টনের গ্যালারি যেন টোকিওতে পরিণত হয়।

 

প্রথমার্ধ শেষ হয় জাপানের ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে। ব্রাজিল সমর্থকদের মুখে তখন উদ্বেগ স্পষ্ট।

 

বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। লুকাস পাকেতা চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে তাঁর জায়গায় নামানো হয় তরুণ এনদ্রিককে। সেই পরিবর্তনের পরই আক্রমণে গতি ফিরে পায় ব্রাজিল। ৫৪ মিনিটে প্রায় সমতা ফিরিয়ে ফেলেছিলেন কাসেমিরো। কর্নার থেকে আসা বলে তাঁর হেড গোললাইন পেরিয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। ভিএআর পর্যালোচনার পরও গোল দেওয়া হয়নি।

 

তবে মাত্র দুই মিনিট পরই অপেক্ষার অবসান ঘটে।

গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির দারুণ ক্রস থেকে কাসেমিরো হেডে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। ৩৪ বছর ১২৬ দিন বয়সে বিশ্বকাপে গোল করে তিনি ব্রাজিলের ইতিহাসেও জায়গা করে নেন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে বেবেতোর পর এত বেশি বয়সে বিশ্বকাপে গোল করা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার আর ছিলেন না।

 

গোলের পর ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মার্তিনেল্লি ও এনদ্রিক একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকেন। ম্যাচের ৭০ মিনিটে ভিনিসিয়ুস প্রায় গোল পেয়ে গিয়েছিলেন। টোমিয়াসুকে কাটিয়ে নেওয়ার পর তাঁর নেওয়া শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন জিওন সুজুকি। পুরো ম্যাচেই জাপানের এই গোলরক্ষক অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন।

 

অন্যদিকে জাপানও বসে থাকেনি। দ্বিতীয়ার্ধে জুনিয়া ইতো এবং তাকেফুসা কুবোকে নামিয়ে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করে তারা। কয়েকবার ব্রাজিলের রক্ষণকেও ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর রেফারি ছয় মিনিট অতিরিক্ত সময় দেন। তখন অনেকেই ধরেই নিয়েছিলেন ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে।

 

কিন্তু নাটক তখনও বাকি ছিল।

যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে রায়ান ডান প্রান্তে বল জিতে ব্রুনো গিমারাইসের কাছে পাস দেন। ব্রুনো নিজে শট না নিয়ে বল বাড়িয়ে দেন মার্তিনেল্লির দিকে। এক মুহূর্ত সময় নিয়ে ডান পায়ের শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের ভেতরে।

 

জিওন সুজুকি বলে হাত লাগালেও সেটি ঠেকাতে পারেননি। বল ডান পোস্টের ভেতর দিক ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়। গোলের পর পুরো স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হয়। সতীর্থদের সঙ্গে উদ্‌যাপনে মেতে ওঠেন মার্তিনেল্লি। ব্রাজিলের বেঞ্চ থেকেও সবাই মাঠে নেমে আসেন।

 

পরিসংখ্যানেও ম্যাচে ব্রাজিল ছিল এগিয়ে। বলের দখল, পাসের সংখ্যা, শট এবং আক্রমণে এগিয়ে ছিল সেলেসাওরা। তবে জাপানের রক্ষণ ও গোলরক্ষক সুজুকির পারফরম্যান্স ম্যাচটিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে রেখেছিল। এই জয়ের মাধ্যমে ব্রাজিল শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে। পরবর্তী পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আইভরিকোস্ট অথবা নরওয়ে।

 

তবে এই ম্যাচ ব্রাজিলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছে। প্রথমার্ধের অগোছালো, আত্মবিশ্বাসহীন ব্রাজিল এবং দ্বিতীয়ার্ধের আক্রমণাত্মক, আত্মবিশ্বাসী ব্রাজিল-এই দুই রূপের মধ্যে পার্থক্য অনেক। বিশ্বকাপ জিততে চাইলে আনচেলত্তির দলকে দ্বিতীয়ার্ধের সেই ব্রাজিলটাকেই ধরে রাখতে হবে।

শেষ মুহূর্তে গোলের পর ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস

তবু হিউস্টনের রাত শেষ হয়েছে হলুদ উৎসবে। আর সেই উৎসবের কেন্দ্রে ছিলেন একজন-গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। তাঁর একটি শট, একটি মুহূর্ত এবং একটি গোলই ব্রাজিলকে বাঁচিয়ে রাখল বিশ্বকাপের মঞ্চে।


সম্পর্কিত নিউজ