{{ news.section.title }}
টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসকে হারাল মরক্কো
২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলে বিশ্ব ফুটবলকে চমকে দিয়েছিল মরক্কো। চার বছর পর উত্তর আমেরিকার মাটিতে তারা আবারও প্রমাণ করল, আগের সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। মন্তেরেইয়ের এস্তাদিও বিবিভিএতে নাটকীয় এক ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৩–২ গোলে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দলটি। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ১–১ সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় স্নায়ুক্ষয়ী এক টাইব্রেকার লড়াইয়ে।
এই বিশ্বকাপে জার্মানির বিদায়ের কয়েক ঘণ্টা পরই আরেক ইউরোপীয় শক্তির পতন দেখল ফুটবল বিশ্ব। গ্রুপ পর্বে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে আসা নেদারল্যান্ডস শেষ পর্যন্ত থেমে গেল মরক্কোর দৃঢ়তা, সংগঠিত রক্ষণ এবং মানসিক শক্তির সামনে।
ম্যাচের আগে থেকেই এই লড়াইকে অনেক বিশ্লেষক ‘আগাম ফাইনাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কারণ গ্রুপ পর্বে দুই দলই ছিল দুর্দান্ত ছন্দে। নেদারল্যান্ডস গ্রুপ এফের চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে ওঠে, অন্যদিকে ব্রাজিলের পর গ্রুপ সি থেকে রানার্সআপ হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছিল মরক্কো। ম্যাচের আগে মরক্কো কোচ নাবিল ওহাবি বলেছিলেন, নকআউটে আগের সব ফল অর্থহীন, এখানে নতুন মানসিকতা নিয়ে নামতে হবে। তাঁর সেই কথার বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে মাঠে।
ম্যাচের শুরু থেকেই মরক্কো নিজেদের পরিকল্পনা পরিষ্কার করে দেয়। আক্রমণে ব্রাহিম দিয়াজ, ইসমাইল সাইবারি ও আজেদিন ওউনাহির গতিময় ফুটবল নেদারল্যান্ডসকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। প্রথমার্ধে বলের দখলে খুব বেশি পিছিয়ে না থাকলেও আক্রমণের ধার এবং সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে ছিল আফ্রিকার দলটি।
আচরাফ হাকিমি ডান প্রান্তে একাধিকবার আক্রমণে উঠে আসেন। ব্রাহিম দিয়াজের একটি শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে ক্রিসেনসিও সামারভিলের পায়ে, কিন্তু মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু দারুণভাবে সেই প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন।
রোনাল্ড কোম্যানের দলকে প্রথমার্ধে কিছুটা ছন্নছাড়া দেখায়। ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং এবং রায়ান গ্রাভেনবার্খ মাঝমাঠে স্বাভাবিক প্রভাব রাখতে পারেননি। ব্রায়ান ব্রবি এবং কোডি গাকপোও নিয়মিত বল পাচ্ছিলেন না।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি বদলাতে শুরু করে। নেদারল্যান্ডস ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায় এবং ৭২ মিনিটে অবশেষে এগিয়ে যায়। ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত একটি আক্রমণে বক্সে ঢুকে পড়েন ক্রিসেনসিও সামারভিল। পড়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে তিনি বল বাড়িয়ে দেন কোডি গাকপোর কাছে। বক্সের ভেতর থেকে জোরালো শটে বুনুকে পরাস্ত করেন ডাচ ফরোয়ার্ড।
গোলটির আবেগ ছিল অন্যরকম। কয়েক দিন আগে স্ত্রী নোয়া ফন ডার বিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, তাদের অনাগত সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা গেছে। সেই ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও দলের সঙ্গে ছিলেন গাকপো। গোলের পর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন তিনি, চোখে ছিল আবেগের ছাপ। সতীর্থরা ছুটে এসে তাঁকে ঘিরে ধরেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও ম্যাচ শেষে এই গোলকে গাকপোর জন্য একটি আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
গোল করার পর নেদারল্যান্ডস ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মরক্কো হাল ছাড়েনি। ম্যাচের শেষ দিকে ক্রমেই আক্রমণের মাত্রা বাড়াতে থাকে তারা। বিশেষ করে বদলি নামা সুফিয়ান রাহিমি এবং তালবি ডাচ রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করেন।
যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যা ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। বাঁ প্রান্ত থেকে শেমসদিন তালবির ক্রস বক্সে ভেসে আসে। ভার্জিল ফন ডাইক বল ক্লিয়ার করতে গেলেও তাঁর পেছন থেকে উঁচুতে উঠে দুর্দান্ত হেডে সমতা ফেরান ইসা দিওপ।
স্টেডিয়ামে তখন মরক্কোর সমর্থকদের উল্লাস। ১–১ সমতায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে মরক্কোই বেশি বিপজ্জনক ছিল। ৯৬ মিনিটে সুফিয়ান রাহিমি প্রায় নিশ্চিত গোলের সুযোগ পান। খুব কাছ থেকে নেওয়া তাঁর শট অবিশ্বাস্যভাবে ঠেকিয়ে দেন বার্ট ভারব্রুগেন। ম্যাচের অন্যতম সেরা সেভ ছিল সেটি।
অন্যদিকে ডাচ গোলরক্ষকও অতিরিক্ত সময়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন। কিন্তু দুই দলই আর গোলের দেখা পায়নি।
এরপর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। আর সেখানেই দেখা যায় একের পর এক নাটক।
দুই দল মিলিয়ে মোট পাঁচটি শট মিস হয়। নেদারল্যান্ডস তিনটি এবং মরক্কো দুটি শট নষ্ট করে। ডাচদের হয়ে ব্যর্থ হন ক্রিসেনসিও সামারভিলসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। অন্যদিকে মরক্কোর গোলরক্ষক বুনু আবারও বড় মঞ্চে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন।
শেষ পর্যন্ত ইসমাইল সাইবারি জয়সূচক পেনাল্টি থেকে গোল করলে মরক্কো ৩–২ ব্যবধানে টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করে।
পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের তুলনায় মরক্কো বেশি আক্রমণ করেছে এবং বেশ কয়েকটি পরিষ্কার সুযোগও তৈরি করেছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকও মনে করছেন, ১২০ মিনিটের খেলায় আফ্রিকার দলটিই ছিল বেশি ইতিবাচক এবং আক্রমণাত্মক।
ম্যাচের পর নেদারল্যান্ডস কোচ রোনাল্ড কোম্যানের কৌশল নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এত রক্ষণাত্মক মানসিকতা ডাচদের বিপদে ফেলেছে। অন্যদিকে মরক্কো আবারও দেখিয়েছে কেন তারা সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর নকআউট দল।
২০২২ সালে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল মরক্কো। এবারও তারা ইতিহাস লেখার পথে এগিয়ে চলেছে। শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে কানাডা।
আর নেদারল্যান্ডসের জন্য এই হার একটি বড় হতাশা হয়ে থাকবে। গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করা, আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা দলটি শেষ পর্যন্ত থেমে গেল এমন এক মরক্কোর কাছে, যারা আবারও প্রমাণ করল-বিশ্বকাপে তাদের আর কোনোভাবেই ‘অঘটনের দল’ বলা যাবে না। বরং তারা এখন বাস্তবিক অর্থেই শিরোপার লড়াইয়ে থাকা একটি শক্তিশালী দল।
টাইব্রেকার
নেদারল্যান্ডস প্রথম শট: কুপমাইনার্সের প্রথম শট থেকে এসেছে গোল।
মরক্কো প্রথম শট: মিস! এল আয়নাউয়ি গোল দিতে পারেননি।
নেদারল্যান্ডস দ্বিতীয় শট: মিস! জাস্টিন ক্লাইভার্ট মেরেছেন পোস্টে।
মরক্কো দ্বিতীয় শট: একটুর জন্য গোল পেলেন রাহিমি!
নেদারল্যান্ডস তৃতীয় শট: গোল। পেয়েছেন ভেগহোর্স্ট।
মরক্কো তৃতীয় শট: শেমসদিন তালবির গোল।
নেদারল্যান্ডস চতুর্থ শট: মিস! কী করলেন কুইন্টেন টিম্বার্স। বল মারলেন পোস্টের বাইরে।
মরক্কো চতুর্থ শট: আশরাফ হাকিমিও গোল দিতে পারলেন না।
নেদারল্যান্ডস পঞ্চম শট: সামারভিলের শট ঠেকিয়ে দিলেন ইয়াসিন বুনো।
মরক্কো পঞ্চম শট: সাইবারির গোল এবং মরক্কো শেষ ১৬ তে।