নেইমারকে বেঞ্চে রাখার কারণ জানালেন আনচেলত্তি

নেইমারকে বেঞ্চে রাখার কারণ জানালেন আনচেলত্তি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল যখন একের পর এক আক্রমণ করেও সমতা ফেরাতে পারছিল না, তখন হিউস্টনের গ্যালারিতে বসে থাকা হাজারো সমর্থকের দৃষ্টি ছিল সাইডলাইনের দিকে। ওয়ার্ম-আপ করছিলেন নেইমার। কয়েকবার বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। টেলিভিশন ক্যামেরাও বারবার তাঁকেই দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই হয়তো মাঠে নামবেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৯০ মিনিট, এমনকি যোগ করা সময় শেষ হলেও মাঠে নামা হয়নি তাঁর।

ব্রাজিলের ২–১ গোলের নাটকীয় জয়ের পর তাই ম্যাচের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নেইমারের না খেলা। ম্যাচ শেষে কার্লো আনচেলত্তির ব্যাখ্যায় অবশ্য পরিষ্কার হয়েছে, এটি কোনো চোট বা শারীরিক সমস্যার কারণে হয়নি। বরং পুরো বিষয়টি ছিল কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

 

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ২৯ মিনিটে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল। কাইশু সানোর গোলে প্রথমার্ধে ১–০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল সেলেসাওরা। সেই সময় থেকেই গ্যালারিতে থাকা ব্রাজিল সমর্থকদের বড় একটি অংশ নেইমারের নাম ধরে স্লোগান দিতে শুরু করেন।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কাসেমিরোর হেডে সমতা ফিরলেও ম্যাচের শেষ পর্যন্ত গোলের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হয় ব্রাজিলকে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ম্যাচ গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নেইমারকে মাঠে নামাবেন আনচেলত্তি। বিশেষ করে ম্যাচ যখন ১–১ সমতায় ছিল, তখনও নেইমারকে কয়েকবার বেঞ্চের সামনে ওয়ার্ম-আপ করতে দেখা যায়।

 

কিন্তু ম্যাচ শেষে ইতালিয়ান এই কোচ জানান, তাঁর পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

‘কাজ’ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আনচেলত্তি বলেন, “অতিরিক্ত সময়ের জন্য আমি নেইমারকে রেখে দিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে এ বিষয়ে আমার কথা হয়েছিল। আমরা যদি সমতায় ফিরতে না পারতাম, তাহলে ৬০ বা ৬৫ মিনিটের দিকে ওকে নামানো হতো। কিন্তু গোল করার পর আমি দলের কাঠামো ভাঙতে চাইনি।”

 

তিনি আরও বলেন, “অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের মতো একজন খেলোয়াড় আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে নামানোর প্রয়োজন হয়নি।”

 

নেইমারকে মাঠে না দেখলেও পুরো ম্যাচে তাঁকে বেশ সক্রিয় দেখা গেছে। বেঞ্চ থেকে সতীর্থদের উৎসাহ দিয়েছেন, গোলের পর উদযাপন করেছেন এবং শেষ বাঁশির পর মাঠে নেমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন।

 

গত সপ্তাহেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৮১ দিন পর জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে ফিরেছিলেন নেইমার। দীর্ঘ ইনজুরি ও পুনর্বাসনের পর তাঁর সেই প্রত্যাবর্তন ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫ মিনিট খেলেছিলেন তিনি। জাপানের বিপক্ষে সেই সময় আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল।

 

বিশ্বকাপ শুরুর আগে চোটের কারণে প্রথম দুই ম্যাচ মিস করেন নেইমার। ডান পায়ের কাফের সমস্যার কারণে আলাদা অনুশীলন করতে হয়েছিল তাঁকে। পরে ধীরে ধীরে দলে ফিরে আসেন এবং স্কটল্যান্ড ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন।

 

আনচেলত্তি অবশ্য শুরু থেকেই নেইমারকে নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের পরও তিনি বলেছিলেন, ব্রাজিলের লক্ষ্য শুধু সুন্দর ফুটবল খেলা নয়, বরং ধাপে ধাপে টুর্নামেন্টে এগিয়ে যাওয়া। তাই নেইমারের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি নিতে চান না তিনি।

 

জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে বেশ এলোমেলো দেখায়। মাঝমাঠে কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারাইস ও লুকাস পাকেতা প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারছিলেন না। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলগত পরিবর্তনের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ব্রাজিলের হাতে চলে আসে।

 

আনচেলত্তি বলেন, “আমাদের দলে অনেক বিকল্প আছে। শুধু প্রথম একাদশ নয়, বেঞ্চেও এমন ফুটবলার আছে যারা যেকোনো সময় ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে। খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগতভাবে ভালো খেলছে, একই সঙ্গে দল হিসেবেও তারা দারুণ সমন্বয় দেখাচ্ছে।”

 

তিনি আরও যোগ করেন, “জাপানকে হারানো সহজ নয়। তারা অত্যন্ত সংগঠিত, দ্রুতগতির এবং কৌশলগতভাবে খুব শক্তিশালী একটি দল। এই ধরনের ম্যাচ জেতা আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে, ব্রাজিলের দ্বিতীয়ার্ধের পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত সময়ের কথা মাথায় রেখে নেইমারকে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত ছিল আনচেলত্তির পরিকল্পনার অংশ। অনেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্রাজিল যদি ১–১ সমতায় অতিরিক্ত সময়ে যেত, তাহলে নেইমারই হতেন আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

 

এদিকে ব্রাজিল শিবিরে নতুন উদ্বেগের নাম কাসেমিরো ও লুকাস পাকেতা। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন দুই ফুটবলারই শারীরিক অস্বস্তিতে পড়েন। বিশেষ করে পাকেতাকে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মাঠ ছাড়তে হয়।

 

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, “কাসেমিরো এবং পাকেতার অবস্থা সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। আগামী ২৪ ঘণ্টা আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন।”

 

ব্রাজিলের সামনে এখন শেষ ষোলোর লড়াই। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে অথবা আইভরি কোস্ট। আর সেই ম্যাচে নেইমারকে শুরু থেকে দেখা যাবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

 

হিউস্টনের নাটকীয় জয়ে ব্রাজিল টিকে গেছে ঠিকই, কিন্তু নেইমারকে ঘিরে অপেক্ষাটাও শেষ হয়নি। বরং মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপের পরের অধ্যায়ের জন্যই হয়তো তাঁকে যত্ন করে তুলে রাখছেন কার্লো আনচেলত্তি।


সম্পর্কিত নিউজ