{{ news.section.title }}
আইভরি কোস্টকে হারিয়ে ব্রাজিলের মুখোমুখি নরওয়ে
নাটকীয় এক লড়াইয়ে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে নরওয়ে। ডালাসের উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে শেষ মুহূর্তে আর্লিং হলান্ডের গোলেই জয় পায় ইউরোপের দলটি। এই জয়ে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল নরওয়ে, আর একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ওঠা আইভরি কোস্টের স্বপ্ন ভেঙে যায়।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই ছিল বেশ সতর্ক। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে নেমেছিল উভয় দল। ফলে প্রথম কয়েক মিনিটে আক্রমণের চেয়ে রক্ষণভাগকে শক্ত রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয় তারা।
আইভরি কোস্টের কোচ এমেরসে ফায়ে তুলনামূলক রক্ষণাত্মক ৪-১-৪-১ ফরমেশনে দল সাজান। দলের অন্যতম আক্রমণভাগের ভরসা আমাদ দিয়ালোকে শুরুর একাদশের বাইরে রাখা অনেককেই অবাক করে। ম্যাচের পর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়।
নরওয়ের হয়ে শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন অধিনায়ক মার্টিন ওদেগার্ড। আর্সেনাল মিডফিল্ডার মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আক্রমণ সাজানোর দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে পুরো ম্যাচজুড়ে আইভরি কোস্টের ডিফেন্ডারদের কঠোর নজরদারিতে ছিলেন আর্লিং হলান্ড।
প্রথমার্ধের ৩৯ মিনিটে নরওয়েকে এগিয়ে দেন আন্তোনিও নুসা। বাম দিক থেকে বক্সের ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের অসাধারণ কার্লিং শটে বল জালে জড়ান ২১ বছর বয়সী এই উইঙ্গার। আরবি লাইপজিগের এই তরুণ ফুটবলারের গোলটি ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
গোল হজমের পর আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করে আইভরি কোস্ট। তবে প্রথমার্ধে তাদের আক্রমণগুলো খুব একটা কার্যকর ছিল না। কিশোর তারকা ইয়ান দিয়োমান্দেকে পুরো ম্যাচজুড়ে চাপে রাখে নরওয়ের রক্ষণভাগ। ডেভিড মোলার উলফের শারীরিক ট্যাকল এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় ম্যাচে নিজের সেরাটা খেলতে পারেননি তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন আনেন কোচ এমেরসে ফায়ে। মাঠে নামানো হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা আমাদ দিয়ালোকে। মাঠে নামার পর থেকেই আইভরি কোস্টের আক্রমণে প্রাণ ফিরে আসে।
৭৪ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে বল নিয়ে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দুর্দান্ত শটে গোল করেন আমাদ। টুর্নামেন্টে এটি ছিল তার দ্বিতীয় গোল। গোলের মাধ্যমে ম্যাচে সমতা ফেরে এবং অতিরিক্ত সময়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
গোল করার আগেই অবশ্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছিলেন আমাদ। কয়েক মিনিট আগে নরওয়ের ডিফেন্ডার টরবইয়র্ন হেগেমের নিশ্চিত গোল লাইন থেকে ফিরিয়ে দেন তিনি। ফলে ম্যাচের নায়ক হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল তার সামনে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেন আর্লিং হলান্ড।
ম্যাচের ৮৬ মিনিটে প্যাট্রিক বার্গের কাটব্যাক থেকে ছয় গজ বক্সের ভেতরে বল পেয়ে জালে পাঠান ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা। পুরো ম্যাচে অপেক্ষাকৃত নীরব থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ঠিকই গোল করেন হলান্ড।
এই গোলের মাধ্যমে নরওয়ের হয়ে টানা ১৩টি প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েন তিনি। এছাড়া চলতি বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে এটি তার পঞ্চম গোল।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ধারাবাহিক স্ট্রাইকারদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন হলান্ড। গ্রুপ পর্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন। নকআউট পর্বেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন নরওয়ের অধিনায়ক।
মার্টিন ওদেগার্ডও ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নুসার গোলে অ্যাসিস্ট করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম তিন ম্যাচেই অ্যাসিস্ট করার বিরল রেকর্ড গড়েন তিনি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই কীর্তি গড়া ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ফুটবলার তিনি।
ম্যাচ শেষে নরওয়ের খেলোয়াড়রা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কারণ ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল দলটি। প্রায় তিন দশক পর বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে উঠেছে নরওয়ে।
অন্যদিকে আইভরি কোস্টের জন্য এটি ছিল ঐতিহাসিক একটি আসর। দলটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলার সুযোগ আসে। যদিও শেষ পর্যন্ত যাত্রা থেমে গেল, তারপরও আফ্রিকার দলটি তাদের লড়াকু মানসিকতা দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে আমাদ দিয়ালো মাঠে নামার পর আইভরি কোস্টের আক্রমণভাগ অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। শেষ মুহূর্তে ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তার ফ্রি-কিক নরওয়ের গোলরক্ষক অরলান নিল্যান্ড দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন। সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে পারত।
ম্যাচ শেষে নরওয়ের কোচ বলেন, তার দল চাপের মধ্যেও ধৈর্য ধরে খেলেছে এবং সঠিক সময়ে সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। তিনি হলান্ড, নুসা এবং ওদেগার্ডের প্রশংসা করেন। এদিকে আইভরি কোস্ট কোচ এমেরসে ফায়ে স্বীকার করেন, শুরুর একাদশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে আমাদ দিয়ালোকে শুরু থেকেই খেলালে ম্যাচের ফল ভিন্নও হতে পারত বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
এই জয়ের ফলে শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে নরওয়ে। জাপানকে হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়েছে হলান্ডরা।
আগামী ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচের বিজয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে। ফলে ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচটি ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্লিং হলান্ডের গোলের ধারাবাহিকতা এবং নরওয়ের নতুন স্বপ্ন কতদূর গড়ায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে ফুটবল বিশ্ব।