সমান গোল, তবু গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে কেন এগিয়ে এমবাপ্পে?

সমান গোল, তবু গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে কেন এগিয়ে এমবাপ্পে?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের মঞ্চে কিলিয়ান এমবাপ্পে যেন অন্য এক ফুটবলার। ক্লাব ফুটবলে তিনি যত বড় তারকা, বিশ্বকাপে এসে যেন তিনি আরও ভয়ংকর, আরও কার্যকর। হ্যাটট্রিক নেই, কিন্তু জোড়া গোল আছে। আর সেটাও একবার নয়, তিন–তিনবার। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের লড়াই এখন রীতিমতো দুই মহাতারকার দ্বৈরথে পরিণত হয়েছে-লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।

গ্রুপ পর্ব শেষে আলোটা ছিল লিওনেল মেসির দিকেই। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে বদলি নেমে এক গোল করে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক ৬ গোল নিয়ে এককভাবে শীর্ষে ছিলেন। কিন্তু নকআউট পর্ব শুরু হতেই ছবিটা বদলে দিয়েছেন এমবাপ্পে।

 

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সুইডেনের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচে জোড়া গোল করে শুধু ফ্রান্সকে শেষ ষোলোয় তোলেননি তিনি, গোলসংখ্যাতেও ছুঁয়ে ফেলেছেন মেসিকে। এর আগে সেনেগালের বিপক্ষে দুই গোল এবং ইরাকের বিপক্ষেও জোড়া গোল করেছিলেন ফরাসি অধিনায়ক। চার ম্যাচ শেষে তাঁর গোলসংখ্যাও দাঁড়িয়েছে ৬-এ।

 

তবে গোল সমান হলেও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখন এগিয়ে এমবাপ্পে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সমান গোল হলে প্রথমে বিবেচনায় আসে অ্যাসিস্ট। সেখানে ফরাসি তারকার আছে দুটি অ্যাসিস্ট, আর মেসির অ্যাসিস্ট নেই। ফলে আনুষ্ঠানিক তালিকায় শীর্ষস্থান এখন এমবাপ্পের।

 

ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও এই লড়াইকে এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখছে। ফরাসি পত্রিকা লেকিপ লিখেছে, “এমবাপ্পে শুধু গোল করছেন না, তিনি প্রতিটি ম্যাচে ফ্রান্সের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।” অন্যদিকে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমগুলো মেসির অভিজ্ঞতা এবং নকআউট ম্যাচের প্রভাবকে বড় করে দেখছে।

 

বিশ্বকাপে এমবাপ্পের পরিসংখ্যান এখন আরও অবিশ্বাস্য হয়ে উঠছে। ২০১৮ সালে চার গোল, ২০২২ সালে আট গোল এবং চলতি আসরে ছয় গোল-সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা এখন ১৮। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল লিওনেল মেসি।

 

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এমবাপ্পে এই ১৮ গোল করেছেন মাত্র ১৮ ম্যাচে। অন্যদিকে মেসির ১৯ গোল করতে খেলতে হয়েছে ২৬ ম্যাচ। ম্যাচপ্রতি গোলের হিসেবে ফরাসি অধিনায়ক অনেকটাই এগিয়ে।

 

ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমও সুইডেন ম্যাচের পর তাঁর অধিনায়কের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, এমবাপ্পে এখন শুধু একজন গোলদাতা নন, তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ নেতা। দলের ভেতরে তাঁর প্রভাব যেমন বেড়েছে, তেমনি বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতাও আরও পরিণত হয়েছে।

 

বিশ্বকাপে বড় ম্যাচ মানেই এমবাপ্পে-এমন ধারণা এখন অনেকের মধ্যেই তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালের ফাইনালে গোল, ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক এবং ২০২৬ সালের নকআউট পর্বে আবারও জোড়া গোল-বিশ্বমঞ্চে ধারাবাহিকভাবে নিজেকে প্রমাণ করে যাচ্ছেন তিনি।

 

গোল্ডেন বুটের লড়াই অবশ্য এখনো অনেক দূর বাকি। মেসির সামনে রয়েছে কেপ ভার্দের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচ। অন্যদিকে ফ্রান্স শেষ ষোলো নিশ্চিত করায় এমবাপ্পের সামনে অন্তত আরও একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকছে। ফলে টুর্নামেন্ট যত এগোবে, এই লড়াইও ততই জমে উঠবে।

 

বর্তমান গোল্ডেন বুট তালিকায় এমবাপ্পে ও মেসির ঠিক পেছনেই আছেন নরওয়ের আর্লিং হলান্ড। চার ম্যাচে তাঁর গোল ৫টি। ব্রাজিলের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে গোল করতে পারলে তিনিও আবার শীর্ষে উঠে আসতে পারেন।

 

এছাড়া ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলের আছে ৪ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোয় খেলতে যাওয়া ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোল ৪টি, সঙ্গে রয়েছে একটি অ্যাসিস্টও। ফলে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখনো অন্তত পাঁচজন শক্তিশালী দাবিদার রয়েছেন।

 

বর্তমান গোল্ডেন বুট তালিকা:

খেলোয়াড় দেশ গোল অ্যাসিস্ট
কিলিয়ান এমবাপ্পেফ্রান্স 
লিওনেল মেসিআর্জেন্টিনা
আর্লিং হলান্ড নরওয়ে
উসমান দেম্বেলে ফ্রান্স
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ব্রাজিল 

 

বিশ্বকাপ ইতিহাসেও এমবাপ্পে এখন অভিজাত এক তালিকার খুব কাছে পৌঁছে গেছেন। বর্তমানে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় আছেন:

 

১. লিওনেল মেসি - ১৯ গোল
২. কিলিয়ান এমবাপ্পে - ১৮ গোল
৩. মিরোস্লাভ ক্লোসা - ১৬ গোল
৪. রোনালদো নাজারিও - ১৫ গোল
৫. গার্ড মুলার - ১৪ গোল

 

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি ফ্রান্স অন্তত সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে এই বিশ্বকাপেই মেসির রেকর্ড ভেঙে দিতে পারেন এমবাপ্পে। কারণ ফরাসি দলটির আক্রমণভাগ এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম ভয়ংকর ইউনিট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যে এমবাপ্পেকে ‘মিস্টার ওয়ার্ল্ড কাপ’ বলে অভিহিত করা শুরু করেছে। কারণ, ক্লাব ফুটবলে তাঁর অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও বিশ্বকাপে তাঁর ধারাবাহিকতার কাছাকাছি এখন খুব কম ফুটবলারই যেতে পেরেছেন।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমবাপ্পের বয়স এখন মাত্র ২৭। অর্থাৎ ২০৩০ বিশ্বকাপেও তাঁকে দেখার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে শুধু মেসির রেকর্ড নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন এক গোলসংখ্যার মানদণ্ডও গড়ে দিতে পারেন ফরাসি অধিনায়ক। এ মুহূর্তে তাই গোল্ডেন বুটের লড়াই শুধু ছয় গোলের দুই তারকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি যেন দুই প্রজন্মের, দুই মহাতারকার এবং দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের লড়াই। একদিকে লিওনেল মেসির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি, ক্ষুধা ও দুর্দান্ত ফর্ম।

 

বিশ্বকাপের নকআউট যত এগোবে, এই দ্বৈরথও ততই নতুন মাত্রা পাবে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতেই আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে-যিনি আবারও প্রমাণ করছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চটাই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।


সম্পর্কিত নিউজ