বিশ্বকাপ ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করলেন নেদারল্যান্ডস কোচ

বিশ্বকাপ ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করলেন নেদারল্যান্ডস কোচ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মরক্কোর কাছে হৃদয়ভাঙা পরাজয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেদারল্যান্ডস ফুটবলে বড় এক পরিবর্তন এসে গেল। রাউন্ড অব ৩২-এ নাটকীয়ভাবে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর প্রধান কোচ রোনাল্ড কোম্যান নিজের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে থাকা এই ডাচ কোচ শেষ পর্যন্ত দলের ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধেই নিয়েছেন।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় ৬৩ বছর বয়সী কোম্যান বলেন, তিনি নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল পুরো দল, কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি এবং একজন প্রধান কোচ হিসেবে শেষ পর্যন্ত দায় তাঁরই।

 

মেক্সিকোর মন্তেরেইয়ে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচটি ডাচ ফুটবলের জন্য এক নির্মম স্মৃতি হয়ে থাকবে। ৭২ মিনিটে কোডি গাকপোর গোলে এগিয়ে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। ম্যাচ শেষ হতে তখন মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ডাচরা শেষ ষোলো নিশ্চিত করেই ফেলেছে। কিন্তু যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে ইসা দিওপের হেডে সমতা ফেরায় মরক্কো। এরপর অতিরিক্ত সময়েও আর কোনো দল গোল করতে পারেনি। টাইব্রেকারে ৩–২ ব্যবধানে জয় পেয়ে ইতিহাস গড়ে আফ্রিকার দলটি।

 

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে কোম্যান প্রথমে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। তিনি বলেছিলেন, হতাশা কাটিয়ে পরদিন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববেন। কিন্তু এক রাতের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি।

 

কোম্যান তাঁর বিদায়ী বার্তায় লিখেছেন, “আমরা সবাই এমন একটি বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে ইতিহাস সৃষ্টি করব। সেটা হয়নি। আমার চেয়ে বেশি হতাশ আর কেউ নয়।” তাঁর এই বক্তব্য পরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

 

এই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের যাত্রা শুরু হয়েছিল বেশ আশাবাদ নিয়েই। গ্রুপ পর্বে তারা সুইডেনকে হারায়, তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জয় পায় এবং আরেকটি ম্যাচে ড্র করে নকআউটে ওঠে। কোডি গাকপো, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং, ভার্জিল ফন ডাইক ও মেমফিস ডিপাইকে ঘিরে ডাচ সমর্থকরা অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল কিংবা সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখছিলেন।

 

কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে কোম্যানের কৌশল নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। গ্রুপ পর্বে ৪-৩-৩ ফরমেশন ব্যবহার করলেও গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে তিনি পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেন। ডাচ সংবাদমাধ্যমের অনেকেই মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তই দলের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ফুটবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

 

যদিও নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন কোম্যান। ম্যাচের পর তিনি বলেছিলেন, আবার সুযোগ পেলে একই কৌশলই বেছে নিতেন। তাঁর মতে, মরক্কোর মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে রক্ষণ মজবুত রাখাই ছিল সঠিক পরিকল্পনা।

 

এটি ছিল নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কোম্যানের দ্বিতীয় অধ্যায়। প্রথমবার ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেই সময় ইউরো ২০২০-এর মূল পর্বে দলকে তুলেছিলেন। এরপর স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার দায়িত্ব নেন। পরে ২০২৩ সালে আবার জাতীয় দলে ফিরে আসেন। তাঁর অধীনেই নেদারল্যান্ডস ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে উঠেছিল।

 

তবে বিশ্বকাপে তাঁর দ্বিতীয় অধ্যায় সুখকর হয়নি। এবারের আসরে নেদারল্যান্ডসের বিদায় শুধু অকাল বিদায়ই নয়, অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটিকে ডাচদের অন্যতম হতাশাজনক বিশ্বকাপ হিসেবেও উল্লেখ করেছে। কারণ, সম্প্রসারিত ৪৮ দলের বিশ্বকাপে রাউন্ড অব ৩২ থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে তাদের।

 

ব্যক্তিগত জীবনও কোম্যানের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে জানা গেছে। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী বার্তিনার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাঁকে ফুটবলের বাইরের জীবন সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি দিয়েছে। বিদায়ী বার্তায় স্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি।

 

এদিকে মরক্কোর বিপক্ষে টাইব্রেকারে ব্যর্থ হওয়া কয়েকজন ডাচ ফুটবলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছেন বলেও খবর প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় গণমাধ্যম। নেদারল্যান্ডস ফুটবল ফেডারেশন এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।

 

নেদারল্যান্ডস ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নাইজেল ডি ইয়ং কোম্যানের অবদানের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, দলের লক্ষ্য ছিল অন্তত সেমিফাইনালে পৌঁছানো, কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তবুও জাতীয় দলের জন্য কোম্যানের অবদানকে তারা সম্মান জানাবে।

 

এখন ডাচ ফুটবলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-রোনাল্ড কোম্যানের উত্তরসূরি কে? ইতোমধ্যে ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমে কয়েকটি নাম ঘুরছে। তাদের মধ্যে আর্নে স্লট অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।

 

একজন খেলোয়াড় হিসেবে ইউরো ১৯৮৮ জয়ের নায়ক ছিলেন রোনাল্ড কোম্যান। কোচ হিসেবেও তিনি বহু স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি এসেছিলেন, তা পূরণ হলো না। শেষ পর্যন্ত মরক্কোর বিপক্ষে সেই টাইব্রেকারই হয়ে থাকল তাঁর ডাচ অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য।


সম্পর্কিত নিউজ