মেসির ঘাড়ে এখন এমবাপ্পের নিশ্বাস

মেসির ঘাড়ে এখন এমবাপ্পের নিশ্বাস
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের সঙ্গে কিলিয়ান এমবাপ্পের সম্পর্কটা যেন অন্যরকম। ক্লাব ফুটবলে তিনি তারকা, জাতীয় দলে তিনি অধিনায়ক, কিন্তু বিশ্বকাপে তিনি যেন এক আলাদা সত্তা। বড় মঞ্চ, বড় প্রতিপক্ষ, কোটি দর্শকের চোখ-এই পরিবেশেই যেন সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন ফ্রান্সের এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপ এলেই তিনি শুধু গোল করেন না, ইতিহাসও লেখেন।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সুইডেনের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচেও সেই পরিচিত দৃশ্যই দেখা গেল। ফ্রান্স ৩–০ গোলে জিতেছে, আর জয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। জোড়া গোল করেছেন তিনি। আর এই দুই গোল তাঁকে শুধু শেষ ষোলোতে তোলেনি, বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকার একেবারে শীর্ষের কাছেও পৌঁছে দিয়েছে।

 

এখন বিশ্বকাপে এমবাপ্পের মোট গোলসংখ্যা ১৮। তাঁর সামনে আছেন শুধু লিওনেল মেসি, যার গোল ১৯। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মেসিকে এই সংখ্যায় পৌঁছাতে খেলতে হয়েছে ২৬টি ম্যাচ, অথচ এমবাপ্পে ১৮ গোল করেছেন মাত্র ১৮ ম্যাচে। ম্যাচপ্রতি গোলের হিসেবে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার হয়ে উঠেছেন।

 

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভাব হয়েছিল তাঁর। সেবার চার গোল করে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে গোল করে পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার কীর্তিও গড়েন। সেই টুর্নামেন্টেই সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন এমবাপ্পে।

 

চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে তিনি আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেন। পুরো আসরে করেন ৮ গোল। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপা জিততে পারেননি, তবে গোল্ডেন বুট জিতে নিয়েছিলেন। সেই হ্যাটট্রিক এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

২০২৬ বিশ্বকাপে এসে যেন তিনি আরও পরিণত। এখন তিনি শুধু গোলদাতা নন, ফ্রান্স দলের অধিনায়কও। তাঁর নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং মাঠের উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি। ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে শুধু দলের সবচেয়ে বড় তারকা নন, তিনি পুরো ড্রেসিংরুমের নেতৃত্বও দিচ্ছেন।

 

সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে শুরু থেকেই তাঁকে দেখা গেছে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে। মাইকেল অলিসে, উসমান দেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলার সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ম্যাচটির পর লিখেছে, ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগগুলোর একটি।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের আক্রমণ এতটাই ধারালো ছিল যে স্কোরলাইন ৩–০ না হয়ে আরও বড়ও হতে পারত। একাধিক শট পোস্টে লেগেছে, বেশ কয়েকটি সুযোগ অল্পের জন্য নষ্ট হয়েছে। আর সেই আক্রমণের কেন্দ্রে ছিলেন এমবাপ্পে।

 

এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে ৬ গোল করেছেন তিনি। একই সংখ্যক গোল রয়েছে লিওনেল মেসিরও। তবে গোল্ডেন বুটের লড়াই এখন দুই মহাতারকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। নরওয়ের আর্লিং হলান্ড, ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে ও ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও অবশ্য পিছিয়ে নেই।

 

বর্তমান গোল্ডেন বুট তালিকা: 
     

খেলোয়াড়  দেশগোল
কিলিয়ান এমবাপ্পেফ্রান্স 
লিওনেল মেসিআর্জেন্টিনা
আর্লিং হলান্ড নরওয়ে
উসমান দেম্বেলে ফ্রান্স 
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রব্রাজিল

 

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকাতেও এখন অনেকটা ওপরে উঠে এসেছেন এমবাপ্পে।

খেলোয়াড়  দেশগোল
লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা১৯
কিলিয়ান এমবাপ্পেফ্রান্স১৮
মিরোস্লাভ ক্লোসাজার্মানি ১৬
রোনালদো নাজারিওব্রাজিল১৫
গার্ড মুলারজার্মানি১৪

বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, মেসির রেকর্ড ভাঙতে তাঁর খুব বেশি সময় লাগবে না।

 

বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ধারাবাহিকতার আরেকটি দিক হলো বড় ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স। ফাইনাল, নকআউট কিংবা গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ ম্যাচ-যখনই ফ্রান্সের গোল প্রয়োজন হয়েছে, তখনই সামনে এসেছেন তিনি। ২০১৮ সালের ফাইনাল, ২০২২ সালের ফাইনাল এবং ২০২৬ সালের নকআউট পর্ব-সব জায়গাতেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

 

দিদিয়ের দেশমও ম্যাচ শেষে তাঁর অধিনায়কের প্রশংসা করেছেন। ফরাসি কোচ বলেন, এই এমবাপ্পে শুধু একজন গোলদাতা নন, তিনি এখন একজন পূর্ণাঙ্গ নেতা। দলের ভেতরে তাঁর প্রভাব অনেক বেড়েছে এবং তিনি সতীর্থদেরও অনুপ্রাণিত করছেন।

 

এমনকি সুইডেন কোচ গ্রাহাম পটারও ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, বর্তমান ফর্মে থাকা ফ্রান্স এবং এমবাপ্পেকে থামানো প্রায় অসম্ভব। তাঁর ভাষায়, “আমরা হয়তো নিখুঁত খেললেও ফ্রান্সকে হারাতে পারতাম না।”

 

ফ্রান্সের সামনে এখন শেষ ষোলোর লড়াই। প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে। আর এমবাপ্পের সামনে রয়েছে আরও বড় লক্ষ্য। গোল্ডেন বুট, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড এবং সম্ভব হলে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা।

 

বিশ্বকাপ ইতিহাসে অনেক বড় বড় তারকা এসেছেন। পেলে, মারাদোনা, রোনালদো, জিদান, ক্লোসা, মেসি-প্রত্যেকেই নিজেদের সময়কে শাসন করেছেন। কিন্তু এমবাপ্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো তাঁর বয়স। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তিনি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাই প্রশ্নটা এখন আর তিনি কত গোল করবেন, সেটা নয়। প্রশ্নটা হলো-বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমবাপ্পে ঠিক কোথায় গিয়ে থামবেন?


সম্পর্কিত নিউজ