শেষ কয়েক মিনিটেই ভেঙে গেল সেনেগালের স্বপ্ন

শেষ কয়েক মিনিটেই ভেঙে গেল সেনেগালের স্বপ্ন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

ম্যাচের বয়স তখন ৮৫ মিনিট। সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে সেনেগালের সমর্থকেরা ইতোমধ্যেই শেষ ষোলোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। স্কোরবোর্ডে ২–০ ব্যবধান, মাঠে আফ্রিকার দলটির দাপট, আর বেলজিয়ামের খেলায় তখন হতাশা ও অস্থিরতা। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট ফুটবল যে কতটা নির্মম হতে পারে, তার এক অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে থাকবে বেলজিয়াম–সেনেগালের এই ম্যাচ।

মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বদলে গেছে সবকিছু। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থাকা সেনেগাল শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াই শেষে ৩–২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপ থেকে। আর এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে বেলজিয়াম। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যেই ম্যাচটিকে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করছে।

 

সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে শুরু থেকেই সেনেগাল ছিল বেশি সংগঠিত দল। মাঝমাঠে ইদ্রিসা গানা গুইয়ে, পাপে গুইয়ে এবং হাবিব দিয়ারারা বেলজিয়ামের খেলোয়াড়দের ওপর নিয়মিত চাপ তৈরি করছিলেন। সাদিও মানে ও ইসমাইলা সার বারবার আক্রমণে উঠে বেলজিয়ামের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখছিলেন। অন্যদিকে কেভিন ডি ব্রুইনে, জেরেমি ডকু এবং চার্লস ডি কেতেলারেকে নিয়ে শুরু করা বেলজিয়াম আক্রমণে খুব বেশি ধার দেখাতে পারেনি।

 

২৫ মিনিটে প্রথম গোল পায় সেনেগাল। ডান দিক থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে হাবিব দিয়ারা বল পেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়াকে পরাস্ত করেন। এই গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি চলে যায় আফ্রিকার দলটির হাতে। বেলজিয়ামের রক্ষণে থিয়েট, মেখেলে এবং কাস্তানে বারবার সমস্যায় পড়ছিলেন।

 

প্রথমার্ধ শেষে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল সেনেগাল। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে বেলজিয়াম। কিন্তু উল্টো ৫১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে সেনেগাল। ইসমাইলা সার দুর্দান্ত এক গোল করে স্কোরলাইন ২–০ করেন। তখন মনে হচ্ছিল, আফ্রিকার দলটি অনায়াসেই শেষ ষোলো নিশ্চিত করতে যাচ্ছে।

 

বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া তখন একের পর এক পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। মাঠে নামানো হয় রোমেলু লুকাকুকে। অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকার ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ সময় নিষ্প্রভ থাকার পর হঠাৎ করেই জেগে ওঠে বেলজিয়াম।

 

৮৬ মিনিটে প্রথম গোল শোধ করেন লুকাকু। সেই গোলের পর ম্যাচে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় বেলজিয়াম। গ্যালারিতেও তৈরি হয় নতুন উত্তেজনা। আর মাত্র তিন মিনিট পর ৮৯ মিনিটে সমতাসূচক গোল করেন ইউরি টিলেমান্স। মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল হজম করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সেনেগাল।

 

নির্ধারিত সময় ২–২ সমতায় শেষ হলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে আবারও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সেনেগাল। কিন্তু ধীরে ধীরে ম্যাচের গতি বেলজিয়ামের দিকে চলে যেতে থাকে। রোমেলু লুকাকু, টিলেমান্স এবং ট্রোসার্ড মিলে আক্রমণ বাড়াতে থাকেন।

 

যখন সবাই টাইব্রেকারের অপেক্ষায়, তখনই আসে বিতর্কিত সেই মুহূর্ত। ১১৭ মিনিটে লামিন কামারার ট্যাকলে পড়ে যান ইউরি টিলেমান্স। রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে দিলেও পরে ভিএআরের সহায়তায় মনিটরে গিয়ে পরিস্থিতি দেখেন। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর বেলজিয়ামের পক্ষে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সেনেগালের খেলোয়াড়রা। কোচ পাপে থিয়াওও পরে জানান, তাঁর মতে এটি পেনাল্টি ছিল না।

 

১১৯ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন ইউরি টিলেমান্স। বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম দেরিতে আসা জয়সূচক গোলগুলোর একটি এটি। এই গোলের মাধ্যমে ২–০ ব্যবধান থেকে ফিরে ৩–২ ব্যবধানে জয় পায় বেলজিয়াম।

 

ম্যাচ শেষে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল লামিন কামারার কান্না। শেষ মুহূর্তের পেনাল্টির জন্য নিজেকে দায়ী করে ভেঙে পড়েন তিনি। সতীর্থরা, কোচিং স্টাফ এবং এমনকি বেলজিয়ামের ইউরি টিলেমান্সও তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর কান্না যেন থামছিল না। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও ম্যাচ শেষে বলেন, “ফুটবল খুব নিষ্ঠুর একটি খেলা। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত আমরা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছি। কিন্তু একটি ম্যাচ ৮৫ মিনিটের নয়।” তাঁর এই বক্তব্য পরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে।

 

সেনেগালের ডিফেন্ডার ক্রেপিন দিয়াত্তাও বলেন, তাঁরা এই বিশ্বকাপে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি। তাঁর মতে, সেনেগাল ম্যাচটি হারার মতো খেলেনি।

 

অন্যদিকে বেলজিয়ামের জন্য এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং একটি চরিত্রের পরীক্ষা। ২–০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফিরে আসার মানসিক শক্তি দেখিয়েছে তারা। ২০১৮ বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে যেভাবে শেষ মুহূর্তে ফিরে এসেছিল বেলজিয়াম, অনেকেই এই ম্যাচের সঙ্গে সেই ম্যাচের মিল খুঁজছেন।

 

সিয়াটলের রাত শেষ হয়েছে দুই ভিন্ন আবেগে। একদিকে উল্লাসে ভেসেছে বেলজিয়াম, অন্যদিকে কান্নায় ভেঙে পড়েছে সেনেগাল। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ম্যাচের কথা মনে পড়লে হয়তো সবার আগে মনে পড়বে একটি দৃশ্য-মাঠে বসে কান্নায় ভেঙে পড়া লামিন কামারা, যার চোখের জল হয়তো বহু বছর ধরে সিয়াটলের সেই রাতকে স্মরণ করিয়ে দেবে।


সম্পর্কিত নিউজ