লাইভ সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই বাবার মৃত্যুর খবর পেলেন কঙ্গোর কোচ

লাইভ সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই বাবার মৃত্যুর খবর পেলেন কঙ্গোর কোচ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ডিআর কঙ্গোর বিশ্বকাপ স্বপ্নের শেষটা হয়েছে বেদনায়, কিন্তু এই দলটি যে গল্প লিখে গেল, তা ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৫ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ২–১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে আফ্রিকার দলটিকে। তবে ম্যাচ শেষে ডিআর কঙ্গো শিবিরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে মাঠের ফল নয়, বরং কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের ব্যক্তিগত জীবনে।

আটলান্টার মার্সিডিজ–বেনজ স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই সবাই ধরে নিয়েছিল, ইংল্যান্ড খুব সহজেই ম্যাচটি জিতে যাবে। ফিফা র‌্যাঙ্কিং, খেলোয়াড়দের মান, অভিজ্ঞতা-সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল থমাস টুখেলের দল। কিন্তু সপ্তম মিনিটেই সেই হিসাব ওলটপালট করে দেয় ডিআর কঙ্গো।

 

ডান দিক থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে ব্রায়ান চিপেঙ্গা সুযোগ পেয়ে বল জালে পাঠান। গোল হজমের পর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মধ্যে স্পষ্ট অস্থিরতা দেখা যায়। জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা, মর্গান রজার্স ও হ্যারি কেইন একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুললেও ডিআর কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি যেন একাই দেয়াল হয়ে দাঁড়ান।

 

প্রথমার্ধে ইংল্যান্ড বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও গোল করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ৪৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের বল দখল ছিল প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। তারা একাধিকবার লক্ষ্যে শট নেয়, কিন্তু এমপাসির সামনে সব ব্যর্থ হয়ে যায়।

 

বিশেষ করে জুড বেলিংহামের একটি হেড, সাকার কাছ থেকে আসা একটি নিচু শট এবং কেইনের কাছ থেকে আসা দুটি সুযোগ অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন ডিআর কঙ্গোর এই গোলরক্ষক। অনেক বিশ্লেষক ইতোমধ্যেই তাঁর পারফরম্যান্সকে এবারের বিশ্বকাপের সেরা গোলকিপিং প্রদর্শনীগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। থমাস টুখেল একের পর এক কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। বেলিংহাম আরও ওপরে উঠে খেলতে শুরু করেন এবং সাকা ডান দিক থেকে নিয়মিত ক্রস তুলতে থাকেন।

 

৭৫ মিনিট পর্যন্ত ডিআর কঙ্গো ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। তখন বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সম্ভাব্য বড় অঘটনের আলোচনা শুরু হয়ে যায়। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন দেখা ইংল্যান্ডের জন্য এটি ভয়ংকর এক পরিস্থিতি ছিল।

 

অবশেষে ৭৮ মিনিটে সমতা ফেরান হ্যারি কেইন। জুড বেলিংহামের তৈরি করা সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাছ থেকে বল জালে পাঠান ইংল্যান্ড অধিনায়ক। গোলটির মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেন।

 

এরপরও ডিআর কঙ্গো লড়াই চালিয়ে যায়। কিন্তু ৮৬ মিনিটে আবারও আঘাত হানেন কেইন। ডান দিক থেকে আসা ক্রসে হেড করে তিনি ইংল্যান্ডকে ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। সেটিই শেষ পর্যন্ত জয়সূচক গোল হয়ে দাঁড়ায়।

 

ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা উল্লাসে মেতে উঠলেও ডিআর কঙ্গোর খেলোয়াড়দের চোখে ছিল কান্না ও হতাশা। বিশেষ করে গোলরক্ষক এমপাসি দীর্ঘ সময় মাঠেই বসে ছিলেন। ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম এগিয়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। হ্যারি কেইনও ম্যাচ শেষে তাঁর প্রশংসা করেন।

 

এমপাসি পরে অনুবাদকের মাধ্যমে বলেন, “আমি যেন নিজের শরীরটাই উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা জানতাম, হ্যারি কেইনকে ৯০ মিনিট আটকানো খুব কঠিন। মাত্র দুবার আমরা মনোযোগ হারিয়েছি, আর সেই দুবারই সে আমাদের শাস্তি দিয়েছে।”

 

তবে ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে সংবাদ সম্মেলনে।

 

ডিআর কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় দলের প্রেস অফিসার তাঁর কাছে এসে একটি ব্যক্তিগত খবর জানান। দেসাব্রে জানতে পারেন, তাঁর বাবা মারা গেছেন।

 

ম্যাচ চলাকালীন তিনি এই খবর জানতেন না। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের অনেকেই জানান, খবরটি শোনার পর কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি নিশ্চুপ হয়ে যান। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি পুরো পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছিল। এরপরও নিজেকে সামলে নিয়ে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন।

 

ফরাসি এই কোচের জন্য এটি ছিল একই দিনে সবচেয়ে বড় দুটি আঘাত-একদিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়, অন্যদিকে বাবাকে হারানোর খবর।

 

তবে ফল যাই হোক, দেসাব্রের নেতৃত্বে ডিআর কঙ্গো ইতিহাস গড়েছে। ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরে তারা প্রথম গোল করেছে, প্রথম জয় পেয়েছে এবং প্রথমবার নকআউট পর্বে উঠেছে।

 

গ্রুপ পর্বে পর্তুগালের সঙ্গে ১–১ ড্র, কলম্বিয়ার কাছে ১–০ ব্যবধানে হার এবং উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৩–১ গোলের জয় তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম নকআউট নিশ্চিত করেছিল। শেষ ৩২–এ এসে তারা প্রায় ইংল্যান্ডকেও বিদায় করে দিচ্ছিল।

 

হয়তো স্কোরবোর্ড বলবে, ইংল্যান্ড ২–১ গোলে জিতেছে। কিন্তু ডিআর কঙ্গোর জন্য এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি পরাজয়ের গল্প নয়। এটি এমন একটি দলের গল্প, যারা ৫২ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফিরে এসে নিজেদের পরিচয় নতুন করে তুলে ধরেছে।

 

আর সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের জন্য এটি এমন একটি রাত, যেখানে ফুটবল এবং ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে গভীর দুই আবেগ একই সঙ্গে এসে আঘাত করেছে। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে, ফলাফল বদলে যাবে, নতুন চ্যাম্পিয়ন আসবে-কিন্তু আটলান্টার সেই সংবাদ সম্মেলনের নীরব কয়েকটি মুহূর্ত হয়তো দীর্ঘদিন মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব।


সম্পর্কিত নিউজ