হারলেও হৃদয় জিতল কেপ ভার্দে

হারলেও হৃদয় জিতল কেপ ভার্দে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

লিওনেল মেসির গোল, আর্জেন্টিনার জয় কিংবা শেষ ষোলো নিশ্চিত হওয়া-সবই সত্য। কিন্তু মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শুক্রবার রাতের ১২০ মিনিটের গল্পকে শুধু এই তিনটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ করলে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচটির প্রতি অবিচারই করা হবে। কারণ, এই ম্যাচে জয়ী হয়েছে আর্জেন্টিনা, কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের হৃদয় জয় করেছে কেপ ভার্দে।

বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া, মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের একটি দেশ, ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনার চেয়ে ৬৩ ধাপ পিছিয়ে থাকা একটি দল এমন ফুটবল খেলেছে, যা ম্যাচ শেষে বিশ্বের প্রায় সব বড় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। কেউ লিখেছে "রূপকথার সমাপ্তি", কেউ বলেছে "বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাঁপিয়ে দেওয়া ক্ষুদ্র দেশ", আবার কেউ কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে এই ম্যাচের প্রকৃত নায়ক আখ্যা দিয়েছে।

 

ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনাকে পরিষ্কার ফেবারিট ধরা হয়েছিল। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে কেপ ভার্দের জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১০ শতাংশ বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ। কিন্তু কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা আগেই বলেছিলেন, তাঁর দল শুধুই মেসিকে থামানোর পরিকল্পনা করছে না, বরং নিজেদের ফুটবল খেলতেই মাঠে নামবে। শেষ পর্যন্ত ঠিক সেটাই দেখা গেল।

 

মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই বলের দখল নেয় আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠে রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। অন্যদিকে কেপ ভার্দে অপেক্ষা করছিল দ্রুত পাল্টা আক্রমণের।

 

২৯ মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম গোল। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের অসাধারণ লম্বা পাস বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে দ্বিতীয় স্পর্শেই গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার ওপর দিয়ে বল তুলে জালে পাঠান লিওনেল মেসি। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে তাঁর সপ্তম গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২০তম গোল। একই সঙ্গে তিনি টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন। ম্যাচটি ছিল মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ৩০তম ম্যাচও, যা পুরুষ ফুটবলারদের মধ্যে নতুন রেকর্ড। অন্যদিকে এটি ছিল লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা কোচ হিসেবে ১০০তম ম্যাচ।

 

কিন্তু এরপর শুরু হয় অন্য এক গল্প।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে এনজো ফার্নান্দেজের নিশ্চিত গোল ভোজিনিয়া অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন। এরপর যেন গোলপোস্টের সামনে একাই দাঁড়িয়ে যান ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। মেসির একের পর এক শট, ফ্রি-কিক, কাছ থেকে নেওয়া প্রচেষ্টা-সবকিছুর সামনে মানবপ্রাচীর হয়ে ওঠেন তিনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপি তাঁর পারফরম্যান্সকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলকিপিং প্রদর্শনী হিসেবে উল্লেখ করেছে। ম্যাচ শেষে জানা যায়, এই বিশ্বকাপ খেলাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, আর গ্যালারিতে বসে প্রথমবারের মতো ছেলের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখেছেন তাঁর মা।

 

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি পুরো বদলে যায়।

৫৪ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তের শট এমিলিয়ানো মার্তিনেজ কোনোমতে ঠেকান। কিন্তু ৫৯ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। অধিনায়ক রায়ান মেন্দেসের নিখুঁত কাটব্যাক থেকে দুরূহ কোণ থেকে দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরান দেরয় দুয়ার্তে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে কেপ ভার্দের এই গোলের পর মায়ামির গ্যালারিতেও যেন সমর্থনের নতুন ঢেউ ওঠে।

 

গোল হজমের পর আর্জেন্টিনা যেন কিছুটা অস্থির হয়ে পড়ে। স্কালোনি মাঠে নামান হুলিয়ান আলভারেজ, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও নিকোলাস গনসালেসকে। মেসিও আরও নিচে নেমে খেলা তৈরি করতে শুরু করেন। কিন্তু ভোজিনিয়া যেন কিছুতেই হার মানতে রাজি নন। ৬২ মিনিটে মেসির শট, ৭২ মিনিটে তাঁর ফ্রি-কিক এবং শেষদিকে পারেদেসের দূরপাল্লার প্রচেষ্টাও ঠেকিয়ে দেন অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক।

 

নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন তখন ১–১।

অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটেই আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মেসির কর্নার থেকে ম্যাক অ্যালিস্টারের ফ্লিক পেয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে গোল করেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।

 

মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি শেষ।

কিন্তু কেপ ভার্দে তখনও হাল ছাড়েনি।

১০৩ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের দুর্দান্ত বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান সিডনি লোপেস কাবরাল। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের কোনো সুযোগই ছিল না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অনেকেই গোলটিকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বর্ণনা করেছে।

 

ম্যাচ তখন টাইব্রেকারের গন্ধ পাচ্ছে।

ঠিক তখনই আসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর মুহূর্ত।

১১১ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের হাতে লেগে দিক বদলে জালে ঢুকে যায়। আত্মঘাতী এই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

 

তবুও শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় কেপ ভার্দে। ১১৬ মিনিটে কাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ আঙুলের ডগায় ছুঁয়ে কর্নারে পাঠান। ১১৯ মিনিটে গিলসন বেঞ্চিমোলের নিশ্চিত গোলও অসাধারণভাবে রুখে দেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক। শেষ কয়েক মিনিটে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগে যে আতঙ্ক দেখা গেছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে খুব কমই দেখা গেছে।

 

ম্যাচ শেষে মেসি স্বীকার করেন, আর্জেন্টিনার উন্নতির অনেক জায়গা রয়েছে এবং এই জয় যতটা স্বস্তি দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি সতর্ক করেছে। স্কালোনিও বলেন, কেপ ভার্দে শুরু থেকেই সম্মান পাওয়ার যোগ্য দল ছিল এবং তারা সেটি মাঠে প্রমাণ করেছে।

 

গ্রুপ পর্বে স্পেনকে গোলশূন্য ড্র, উরুগুয়ের বিপক্ষে ২–২ এবং সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য সমতায় শেষ করে নকআউটে ওঠা কেপ ভার্দে বিদায় নিলেও বিশ্বকাপকে নতুন এক গল্প উপহার দিল। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের দেশটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ১২০ মিনিট পর্যন্ত লড়াইয়ে বাধ্য করেছে, আর ফুটবল বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে-বিশ্বকাপে কোনো গল্পই অসম্ভব নয়।

 

স্কোরলাইন ইতিহাসে লেখা থাকবে-আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২।

কিন্তু এই ম্যাচের স্মৃতি যখন ফিরে আসবে, তখন অনেকের মনেই প্রথমে ভেসে উঠবে না মেসির গোল কিংবা রোমেরোর জয়সূচক হেড। মনে পড়বে ভোজিনিয়ার অবিশ্বাস্য সেভ, কাবরালের অসাধারণ গোল এবং এমন এক কেপ ভার্দের কথা, যারা হারলেও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজয়ীদের একজন হয়ে মাঠ ছেড়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ