{{ news.section.title }}
ঘানাকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে কলোম্বিয়া
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের দুর্দান্ত ছন্দ ধরে রেখেছে কলম্বিয়া। কানসাস সিটির দমবন্ধ গরমে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে নেস্তর লরেঞ্জোর দল। ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন জোন আরিয়াস। তবে স্কোরলাইন ১-০ হলেও পুরো ম্যাচজুড়ে আধিপত্য ছিল কলম্বিয়ার। অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেও ব্যবধান বাড়াতে না পারার আক্ষেপই ছিল তাদের একমাত্র হতাশা।
এই জয়ে আগামী মঙ্গলবার (বাংলাদেশ সময়) ভ্যাঙ্কুভারে শেষ ষোলোয় সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে কলম্বিয়া। সেই বাধা পেরোতে পারলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সম্ভাব্য লাতিন আমেরিকান মহারণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
ম্যাচটি শুরু হয়েছিল প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। রাত ১০টার পরও কানসাস সিটিতে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। গরমের কারণে খেলোয়াড়দের জন্য কুলিং ব্রেকের ব্যবস্থাও রাখা হয়। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা থাকলেও শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে কলম্বিয়া।
তবে ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগটি তৈরি করে ঘানা। খেলা শুরুর প্রথম মিনিটেই মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে দূরপাল্লার শট নেন টমাস পার্টে। বলটি অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে গেলে অল্পের জন্য রক্ষা পায় কলম্বিয়া।
শুরুর ১০ মিনিট ছিল ঘটনাবহুল। ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন কলম্বিয়ার স্ট্রাইকার জন কর্দোবা। কুঁচকির চোটে তাকে তুলে নিতে হয়। তার জায়গায় নামেন লুইস সুয়ারেজ। অন্যদিকে ঘানার রাইট-ব্যাক মারভিন সেনায়াও হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে মাঠ ছাড়েন। তার পরিবর্তে নামানো হয় আলিদু সেইদুকে।
এই পরিবর্তনই পরে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
১৪তম মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত গতিতে উঠে আসেন বদলি খেলোয়াড় লুইস সুয়ারেজ। তার নিখুঁত ক্রস পেয়ে ফাঁকায় থাকা জন আরিয়াস ভলিতে বল জালে পাঠিয়ে কলম্বিয়াকে এগিয়ে দেন। ঘানার বদলি ডিফেন্ডার আলিদু সেইদু আরিয়াসকে মার্ক করতে ব্যর্থ হন। আর সেই ভুলেরই মূল্য দিতে হয় আফ্রিকার দলটিকে।
গোল হজমের পর কিছুটা আক্রমণে ওঠে ঘানা। ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড অঁতোয়ান সেমেনিও একটি শট নিলেও তা ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে কর্নার হয়ে যায়। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সেমেনিও গোলমুখে একটি শটও রাখতে পারেননি, যা ঘানার আক্রমণভাগের দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে একের পর এক সুযোগ নষ্ট করতে থাকে কলম্বিয়া। লুইস দিয়াস গোলরক্ষক লরেন্স আতি জিগিকে একা পেয়েও পোস্টের বাইরে শট মারেন। এরপর জেফারসন লেরমার ক্রস থেকে লুইস সুয়ারেজের হেডও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ড্যানিয়েল মুনিয়োজের ক্রস থেকে ইয়োহান মোহিকার হেড অসাধারণ দক্ষতায় গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন লরেন্স আতি জিগি। প্রথমার্ধেই অন্তত তিনটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেন ঘানার গোলরক্ষক।
বিরতির সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন নেস্তর লরেঞ্জো। অভিজ্ঞ অধিনায়ক হেমস রদ্রিগেজকে তুলে নেওয়া হয়। এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে তার ১৩০তম ম্যাচ। তার পরিবর্তে মাঠে নামেন রিচার্ড রিওস।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পরপরই রিচার্ড রিওস একটি নিচু শট নেন, যা অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়।
এরপর আবারও ঘানার গোলরক্ষক জিগির পরীক্ষা নেন গুস্তাভো পুয়ের্তা। তার জোরালো শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন তিনি।
ম্যাচের ৬০ মিনিটের দিকে লুইস দিয়াস বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়ে যায়। টমাস পার্টে বল হারানোর পর জেফারসন লেরমার পাস থেকে গোল করেছিলেন দিয়াস। তবে ভিএআর পর্যালোচনায় অফসাইড ধরা পড়ে।
এর কিছুক্ষণ পর পাল্টা আক্রমণে আবারও একা গোলরক্ষকের সামনে চলে যান লুইস দিয়াস। গুস্তাভো পুয়ের্তার নিঃস্বার্থ পাস থেকে পাওয়া সুযোগও কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। লরেন্স আতি জিগি দুর্দান্ত সেভ করেন।
৬৯তম মিনিটে ঘানার হয়ে ম্যাচে ফেরার সবচেয়ে বড় সুযোগটি তৈরি করেন টমাস পার্টে। দূর থেকে নেওয়া তার নিচু শট অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়।
এরপরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি কলম্বিয়া।
বদলি খেলোয়াড় হুয়ান ফার্নান্দো কুইন্তেরো দূরপাল্লার শক্তিশালী শট নিলেও তা অল্পের জন্য বাইরে যায়। লুইস দিয়াসের আরেকটি বাঁকানো শট ডিফ্লেক্ট হয়ে কর্নার হয়। কর্নার থেকে ডাভিনসন সানচেসের শক্তিশালী হেডও দারুণভাবে রুখে দেন জিগি।
ঘানা শেষ দিকে অতিরিক্ত সময় আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু পুরো ম্যাচেই তারা একবারও কলম্বিয়ার গোলরক্ষককে প্রকৃত পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি।
পরিসংখ্যানই দুই দলের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়। পুরো ম্যাচে ঘানা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। শুধু এই ম্যাচেই নয়, পুরো টুর্নামেন্টে চার ম্যাচ মিলিয়ে তাদের অন-টার্গেট শট ছিল মাত্র চারটি, যা এবারের বিশ্বকাপে যেকোনো দলের মধ্যে সবচেয়ে কম। অন্যদিকে এই এক ম্যাচেই কলম্বিয়া ঘানার পুরো টুর্নামেন্টের তুলনায় দ্বিগুণ অন-টার্গেট শট নেয়।
ম্যাচ শেষে কলম্বিয়ার কোচ নেস্তর লরেঞ্জো জয় নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও সুযোগ নষ্ট করার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নকআউট পর্বে এত সুযোগ নষ্ট করলে বড় দলগুলোর বিপক্ষে তার খেসারত দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ বলেন, তার দল শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে, তবে আক্রমণভাগে ধার না থাকায় ম্যাচে ফিরতে পারেনি। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দলকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই হারের মধ্য দিয়ে ঘানার বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেল। এবারের আসরে নকআউটে ওঠা আফ্রিকার নয়টি দলের মধ্যে সপ্তম দল হিসেবে বিদায় নিল ব্ল্যাক স্টার্স। এখন আফ্রিকার আশা টিকে আছে শুধু মরক্কো ও মিশরের ওপর।
অন্যদিকে টানা দাপুটে পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপে নিজেদের শিরোপার দাবিকে আরও জোরালো করল কলম্বিয়া। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে নকআউটে ওঠার পর এবার ঘানাকেও হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে লস ক্যাফেতেরোসরা। সামনে সুইজারল্যান্ডের চ্যালেঞ্জ, আর সেই বাধা পেরোতে পারলে কোয়ার্টার ফাইনালে অপেক্ষা করতে পারে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।