বিশ্বকাপ থেকে বিদায়েও গর্বিত কেপ ভার্দে কোচ, ‘দেশের সম্মান বাড়িয়েছি’

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়েও গর্বিত কেপ ভার্দে কোচ, ‘দেশের সম্মান বাড়িয়েছি’
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

ডিফেন্ডিং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এ খেলতে নামার আগেই ইতিহাস লিখেছিল কেপ ভার্দে। মাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত দলে পরিণত হয়েছে। আর মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের পর সেই প্রশংসা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হারলেও মাঠ ছেড়েছে মাথা উঁচু করেই। বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের এই অভিযাত্রাকে বিশ্বকাপের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প হিসেবে বর্ণনা করেছে।

 

ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, যিনি ফুটবল বিশ্বে ‘বুবিস্তা’ নামে পরিচিত, নিজের খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্বের কথা লুকাননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "আমি দল এবং কোচিং স্টাফকে নিয়ে ভীষণ গর্বিত। আমরা আমাদের দেশের সম্মান বাড়িয়েছি। আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলেছি, দুইবার সমতায় ফিরেছি এবং ম্যাচকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছি।"

 

বুবিস্তা আরও বলেন, "আমরা একটি সেট-পিস থেকেই ম্যাচটি হেরেছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমার খেলোয়াড়রা দেখিয়ে দিয়েছে তারা কী করতে পারে। তারা আমাদের দেশের পরিচয়, সাহস ও চরিত্রকে পুরো বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। এই দলটি শুধু ফুটবল খেলেনি, তারা একটি জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছে।"

 

মায়ামির এই ম্যাচে কেপ ভার্দে দুইবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফিরে আসে। লিওনেল মেসির গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর দেরয় দুয়ার্তে সমতা ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ আবার আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিলেও সিডনি লোপেস কাবরালের দুর্দান্ত গোল ম্যাচকে আবার সমতায় নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১১১ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে আত্মঘাতী গোলে পরিণত হলে সেখানেই ভেঙে যায় কেপ ভার্দের রূপকথা।

 

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, "অনেকে বলেছিল আমাদের ড্র সহজ হয়েছে। আজকের ম্যাচ দেখেই বোঝা গেছে বিশ্বকাপে সহজ প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই। কেপ ভার্দে আমাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভুগিয়েছে। আমার খেলোয়াড়রা অতিরিক্ত সময়ের শেষে সম্পূর্ণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।"

 

কেপ ভার্দের এই বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু থেকেই ছিল ব্যতিক্রমী। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৭ নম্বরে থাকা দলটি গ্রুপ পর্বে নিজেদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও হারেনি। প্রথম ম্যাচে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয় তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে দুইবার পিছিয়ে পড়েও উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে। শেষ গ্রুপ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে।

 

কেপ ভার্দের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান

গ্রুপ পর্ব

  • স্পেন ০-০ কেপ ভার্দে
  • উরুগুয়ে ২-২ কেপ ভার্দে
  • সৌদি আরব ০-০ কেপ ভার্দে

রাউন্ড অব ৩২

  • আর্জেন্টিনা ৩-২ কেপ ভার্দে (অতিরিক্ত সময়ে)

চার ম্যাচে একটিও জয় পায়নি কেপ ভার্দে, কিন্তু একটিও ম্যাচে সহজে হারও মানেনি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ছাড়া আর কোনো দল তাদের হারাতে পারেনি।

 

বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় নায়ক ছিলেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তিনি একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে লিওনেল মেসিসহ আর্জেন্টিনার তারকাদের দীর্ঘ সময় হতাশ করে রাখেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগে তিনি বলেছিলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল মাকে গ্যালারিতে বসিয়ে বিশ্বকাপ খেলানো। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পাশাপাশি নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি বিশ্ব ফুটবলেরও সম্মান কুড়িয়েছেন।

 

কেপ ভার্দের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কোচ বুবিস্তার। ২০২০ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনিই প্রথমবারের মতো দলটিকে বিশ্বকাপে তুলেছেন। সীমিত অবকাঠামো, সীমিত বাজেট এবং ইউরোপের বিভিন্ন নিম্ন লিগে খেলা ফুটবলারদের নিয়েই তিনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন, যারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদেরও কাঁপিয়ে দিয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম El País তাঁকে ছোট দেশগুলোর ফুটবলের অন্যতম বড় কণ্ঠস্বর হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

বিদায়ের পর কেপ ভার্দের ড্রেসিংরুমে ছিল কান্না। কারণ তারা জানত, ইতিহাস গড়ার কতটা কাছে গিয়ে ফিরে এসেছে। তবে সেই কান্নার মধ্যেও ছিল গর্ব। খেলোয়াড়েরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, কোচকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। বুবিস্তার ভাষায়, "তারা কাঁদছিল, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল যে তারা আরও এগোতে পারবে। এই বিশ্বাসটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।"

 

দিন শেষে স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে-আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ইতিহাস লেখা হলে, সেখানে এই ছোট্ট আফ্রিকান দেশটির নাম থাকবে সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি হিসেবে। তারা হয়তো ট্রফি জেতেনি, কিন্তু সাহস, শৃঙ্খলা, লড়াই আর আত্মবিশ্বাস দিয়ে বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জয় করেছে। আর সেটিই হয়তো তাদের সবচেয়ে বড় বিজয়।


সম্পর্কিত নিউজ