{{ news.section.title }}
মেসিদের আটবার থামিয়েও বিদায়, তবু বিশ্বকাপের নায়ক ভোজিনিয়া
বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে কেপ ভার্দে। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না শুধু আর্জেন্টিনার জয় কিংবা লিওনেল মেসির রেকর্ড। বরং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বড় অংশের নজর ছিল কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার দিকে। ৪০ বছর বয়সী এই গোলকিপার এমন এক পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন, যা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে জয় পেলেও ম্যাচের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষক। পুরো ম্যাচে তিনি মোট ৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন। লিওনেল মেসি, এনজো ফার্নান্দেজ, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও হুলিয়ান আলভারেজের একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ তিনি দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Associated Press (AP) ম্যাচ শেষে ভোজিনিয়ার পারফরম্যান্সকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলকিপিং প্রদর্শনীগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছে।
প্রথমার্ধেই মেসির গোলের পর আর্জেন্টিনা ব্যবধান বাড়ানোর একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু ভোজিনিয়া যেন একাই হয়ে ওঠেন কেপ ভার্দের শেষ ভরসা। বিরতির আগে এনজো ফার্নান্দেজের শট রুখে দেন অসাধারণ প্রতিক্রিয়ায়। দ্বিতীয়ার্ধে ৬২ মিনিটে মেসির কাছ থেকে নিশ্চিত গোল বাঁচান তিনি। ৭২ মিনিটে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন। ম্যাচের শেষদিকে পারেদেসের দূরপাল্লার শট এবং অতিরিক্ত সময়েও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণ ঠেকিয়ে দলকে লড়াইয়ে রাখেন।
বিশ্বকাপের আগে খুব কম মানুষই ভোজিনিয়ার নাম জানতেন। কিন্তু মাত্র একটি ম্যাচেই তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় চলে এসেছেন। ৪০ বছর বয়সেও তাঁর ক্ষিপ্রতা, পজিশনিং এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা ফুটবল বিশ্লেষকদেরও মুগ্ধ করেছে। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ম্যাচ শেষে তাঁকে "ম্যান অব দ্য ম্যাচ না হলেও ম্যাচের অন্যতম নায়ক" হিসেবে উল্লেখ করেছে।
শুধু এই ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই কেপ ভার্দের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার ছিলেন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে তাঁর একাধিক সেভ ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ ড্রয়ের ম্যাচেও শেষ দিকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বল আটকান তিনি। সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে যখন কেপ ভার্দে ইতিহাস গড়ে প্রথমবার নকআউটে ওঠে, সেদিনও রক্ষণভাগের নেতৃত্বে ছিলেন ভোজিনিয়া।
এরপর আসে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা-বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
ম্যাচে কেপ ভার্দে দুইবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফিরেছিল। প্রথমে দেরয় দুয়ার্তে এবং পরে অতিরিক্ত সময়ে সিডনি কাবরালের গোলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যায় আফ্রিকার দলটি। কিন্তু ১১১ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে আত্মঘাতী গোলে পরিণত হলে সেখানেই শেষ হয়ে যায় কেপ ভার্দের স্বপ্ন।
ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো (বুবিস্তা) নিজের খেলোয়াড়দের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, তাঁর দল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে নিজেদের চরিত্র, সাহস ও সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে এবং দেশের মানুষ এই দলের জন্য গর্ব করতে পারে। তাঁর মতে, একটি সেট-পিস থেকেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে, কিন্তু তাঁর খেলোয়াড়রা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে সফল হয়েছে।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও প্রতিপক্ষের প্রশংসা করতে ভোলেননি। তিনি বলেন, অনেকেই ম্যাচটিকে সহজ ভাবলেও বাস্তবে কেপ ভার্দে তাঁর দলকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচের ফল নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়নি। বিশ্বকাপে সহজ প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই-কেপ ভার্দে সেটিই আবারও প্রমাণ করেছে।
এই বিশ্বকাপেই প্রথমবার অংশ নিয়েছিল কেপ ভার্দে। অথচ গ্রুপ পর্বে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের সঙ্গে ০-০, দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ ড্র করে তারা নকআউটে জায়গা করে নেয়। এরপর আর্জেন্টিনার মতো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত খেলতে বাধ্য করে বিদায় নেয়।
কেপ ভার্দের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান সংখ্যার বিচারে হয়তো খুব বড় নয়। চার ম্যাচে তারা কোনো জয় পায়নি। কিন্তু তিনটি ড্র এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াই প্রমাণ করে দিয়েছে-এই দলটি আর শুধুই ছোট কোনো দেশের প্রতিনিধি নয়, তারা বিশ্ব ফুটবলের নতুন এক প্রতিদ্বন্দ্বী।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক দল বিদায় নেওয়ার পর হারিয়ে যায়। কিন্তু কেপ ভার্দে এমন একটি দল, যাদের বিদায়ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর সেই স্মৃতির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে থাকবেন গোলপোস্টের সামনে অদম্য এক প্রাচীর-ভোজিনিয়া। তাঁর আটটি সেভ হয়তো কেপ ভার্দেকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে পারেনি, কিন্তু বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের শ্রদ্ধা ও সম্মান ঠিকই এনে দিয়েছে।