বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও আনচেলত্তিতেই আস্থা ব্রাজিলের

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও আনচেলত্তিতেই আস্থা ব্রাজিলের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে প্রত্যাশার অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এই পরাজয়ের পর দেশটির গণমাধ্যম ও সমর্থকদের একাংশ কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশল, বিশেষ করে ম্যাচে খেলোয়াড় বদলের সিদ্ধান্ত এবং পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে কঠোর সমালোচনা করলেও, ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, এই একটি ম্যাচের ফলের ভিত্তিতে কোচ পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। বরং ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত আনচেলত্তির নেতৃত্বেই নতুন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হবে।

ব্রাজিলের নির্বাহী জাতীয় দল পরিচালক রদ্রিগো কায়েতানো বলেছেন, জাতীয় দলের জন্য ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, বিশ্বকাপ থেকে হতাশাজনক বিদায় অবশ্যই কষ্টের, তবে একটি ম্যাচ বা একটি টুর্নামেন্ট দেখে পুরো প্রকল্প বদলে ফেললে ব্রাজিল আরও পিছিয়ে পড়বে। তাই প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হলেও আনচেলত্তির নেতৃত্বে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে।

 

নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে আনচেলত্তির কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ভালো খেলতে থাকা ম্যাথেউস কুনিয়া ও রায়ানকে তুলে দ্বিতীয়ার্ধে নেইমার ও এনদ্রিককে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত, ব্রুনো গিমারাইসকে পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া এবং ম্যাচের শেষভাগের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিবিএফের ভেতরেও ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে স্বীকার করা হয়েছে, কিছু সিদ্ধান্ত আরও ভালো হতে পারত। তবে এসবকে তারা কোচের প্রতি আস্থাহীনতার কারণ হিসেবে দেখছে না।

 

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তিও নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইতালিয়ান কোচের মতে, ব্রাজিল ম্যাচে খারাপ খেলেনি; বরং বেশ কয়েকটি পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল। তাঁর ভাষায়, স্কোরলাইন ০-০ থাকা অবস্থায় ব্রাজিলের একাধিক সুযোগ ছিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার। আক্রমণে নতুন গতি এবং গভীরতা আনতেই তিনি বদলি খেলোয়াড়দের মাঠে নামিয়েছিলেন। তবে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

 

আনচেলত্তি আরও বলেন, ‘ফুটবলে কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেগুলো ম্যাচের পর ভুল মনে হতে পারে। কিন্তু কোচ হিসেবে প্রতিটি পরিবর্তনই আমি দলের জয়ের কথা ভেবেই করেছি। আমার বিশ্বাস, খেলোয়াড়রা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে এবং আজকের ফলাফল আমাদের পারফরম্যান্সকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।’

 

ব্রাজিলের বিদায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশটির বিভিন্ন ক্রীড়া বিশ্লেষক আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সিবিএফ দ্রুত সেই জল্পনা থামিয়ে দেয়। সংস্থাটি জানায়, বিশ্বকাপের আগে যে চুক্তি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, সেটি বহাল থাকছে এবং নতুন বিশ্বকাপ চক্রে প্রয়োজনীয় সময় ও স্বাধীনতা দেওয়া হবে আনচেলত্তিকে।

 

তবে কোচিং স্টাফে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। আনচেলত্তির দীর্ঘদিনের সহকারী এবং ছেলে ডেভিড আনচেলত্তি ব্রাজিল জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে ক্লাব ফুটবলে প্রধান কোচ হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। ফলে আগামী আন্তর্জাতিক সূচি থেকে ব্রাজিলের কোচিং স্টাফে নতুন মুখ দেখা যাবে।

 

সিবিএফ জানিয়েছে, কেবল কোচিং স্টাফ নয়, জাতীয় দলের সামগ্রিক কাঠামোও নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে। খেলোয়াড় নির্বাচন, পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ, মেডিকেল ও প্রযুক্তিগত বিভাগ-সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হবে ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে একটি স্থায়ী ও প্রতিযোগিতামূলক দল গড়ে তোলা।

 

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর আনচেলত্তি নিজেও ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই পরাজয় ব্রাজিল ফুটবলের সমাপ্তি নয়; বরং একটি নতুন যাত্রার শুরু। তিনি বলেন, ‘এটি শেষ নয়, বরং নতুন একটি চক্রের সূচনা। আমরা এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নেব, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করব এবং দলকে আরও শক্তিশালী করে ফিরিয়ে আনব।’

 

সব মিলিয়ে নরওয়ের কাছে অপ্রত্যাশিত হারে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বিশ্বাস করছে, দীর্ঘমেয়াদে দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কার্লো আনচেলত্তিই সঠিক ব্যক্তি। তাই সমালোচনা, হতাশা ও ব্যর্থতার মাঝেও ইতালিয়ান এই কিংবদন্তি কোচের হাতেই ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিল জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়েছে সিবিএফ।


সম্পর্কিত নিউজ