অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ হলো রোনালদোর ‘লাস্ট ডান্স’

অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ হলো রোনালদোর ‘লাস্ট ডান্স’
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

স্পেনের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ১-০ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে গেল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক বিশ্বকাপ অধ্যায়ও। কারণ, এই ম্যাচটিই ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।

ডালাস স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ অধিনায়ক কিছুক্ষণ স্থির হয়ে মাঠেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর ধীর পায়ে সতীর্থদের সঙ্গে করমর্দন করেন, সমর্থকদের দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান এবং গভীর হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়েন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ভাষায়, এটি ছিল একজন কিংবদন্তির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের নিঃশব্দ সমাপ্তি।

 

পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যে ছিল স্নায়ুচাপের লড়াই। দুই দলই খুব বেশি ঝুঁকি নেয়নি। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই যোগ করা সময়ে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর গোলে জয় নিশ্চিত করে স্পেন। সেই এক গোলেই শেষ হয়ে যায় পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।

 

ম্যাচের আগেই সংবাদ সম্মেলনে রোনালদো জানিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে তিনি আগেই নিজের নাম লিখিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো শিরোপা ছাড়াই।

 

ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে এসে রোনালদো হতাশা লুকাননি। তবে একই সঙ্গে নিজের ক্যারিয়ার নিয়েও গর্ব প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, "এভাবে বিশ্বকাপ শেষ হওয়াটা অবশ্যই কষ্টের। কিন্তু আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়েছি। আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়েই মাঠ ছাড়ছি। ফুটবল এমনই-কখনও জিততে হয়, কখনও হারতে হয়।"

 

রোনালদো আরও বলেন, এই মুহূর্তে তিনি জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ বিশ্বকাপকে বিদায় বললেও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা এখনই দেননি তিনি।

 

পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে এটি ছিল তাঁর ষষ্ঠ আসর। ২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন তিনি। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬-টানা ছয়টি বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই কীর্তি বিশ্ব ফুটবলে আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই।

 

চলতি বিশ্বকাপে রোনালদো তিনটি গোল করেন। এর মধ্যে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে নকআউট পর্বে করা পেনাল্টি গোলটি ছিল তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম নকআউট গোল। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১১, যা তাঁকে পর্তুগালের সর্বকালের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

যদিও বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁর হাতে ওঠেনি, আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর অর্জনের তালিকা ঈর্ষণীয়। পর্তুগালকে ২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০১৯ এবং ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগ জেতানোর নায়ক ছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে সেই অর্জনের কথাও স্মরণ করেন রোনালদো।

 

তিনি বলেন, "আমরা পর্তুগালের জন্য তিনটি বড় শিরোপা জিতেছি। দেশের হয়ে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি গর্বিত।" একই সঙ্গে বিদায়ী কোচ রবার্তো মার্তিনেজেরও প্রশংসা করেন তিনি।

 

বিশ্বকাপ ট্রফি অধরাই থেকে গেলেও আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে রোনালদোর নাম থাকবে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে। ছয়টি বিশ্বকাপ, পাঁচটি ব্যালন ডি'অর, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স-এসব অর্জন তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা দিয়েছে। আর ডালাসের সেই রাত হয়তো মনে থাকবে, যেদিন বিশ্বকাপ বিদায় জানাল তার সবচেয়ে বড় কিংবদন্তিদের একজনকে।


সম্পর্কিত নিউজ