শেষ মুহূর্তের গোলে পর্তুগালকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন

শেষ মুহূর্তের গোলে পর্তুগালকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ক্যারিয়ারের সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপটি রাঙাতে চেয়েছিলেন আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় দিয়ে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল শেষ ষোলোতেই। আইবেরিয়ান ডার্বির উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে শেষ মুহূর্তে মিকেল মেরিনোর গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে স্পেন। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়েরও কার্যত ইতি ঘটল তিক্ত এক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।

ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশের শক্তির লড়াই। মাঠে যেমন ছিল বিশ্বমানের ফুটবলারদের উপস্থিতি, তেমনি গ্যালারিতেও ছিল হাজার হাজার দর্শকের উচ্ছ্বাস। তবে প্রত্যাশার তুলনায় ম্যাচটি দীর্ঘ সময় গোলশূন্য থাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে প্রতি মিনিটে।

 

ম্যাচের শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল। সপ্তম মিনিটে দূরপাল্লার শটে ভাগ্য পরীক্ষা করেন পর্তুগালের জোয়াও ক্যানসেলো। তবে তার জোরালো শট গোলবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। এর ঠিক এক মিনিট পরই স্পেনের হয়ে বড় সুযোগ তৈরি করেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। লামিন ইয়ামালের দুর্দান্ত পাসে একা গোলরক্ষকের সামনে চলে এলেও শটটি লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি। অল্পের জন্য রক্ষা পায় পর্তুগাল।

 

প্রথম ২০ মিনিটে বলের দখল প্রায় সমান ছিল। মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনহা ও জোয়াও নেভেসের সঙ্গে স্পেনের পেদ্রি, রদ্রি ও মেরিনোর লড়াই ম্যাচটিকে আরও জমিয়ে তোলে।

 

২৩ মিনিটে প্রথমবারের মতো গোলমুখে দেখা যায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। ডান দিক থেকে ক্যানসেলোর বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কঠিন কোণ থেকে শট নেন তিনি। তবে সহজেই বলটি আটকে দেন স্পেন গোলরক্ষক উনাই সিমন।

 

এরপর ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্তটি আসে ২৯ মিনিটে।

ডান প্রান্ত দিয়ে দারুণ আক্রমণ গড়ে তোলেন লামিন ইয়ামাল। তার নিচু ক্রস থেকে প্রথমে শট নেন ইয়ামাল নিজেই, সেটি অসাধারণভাবে ঠেকিয়ে দেন পর্তুগাল গোলরক্ষক দিওগো কস্তা। ফিরতি বলে অ্যালেক্স বায়েনার বাঁকানো শটও অসাধারণ ডাইভ দিয়ে রুখে দেন তিনি।

 

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি বিশ্বমানের সেভ করে ম্যাচে পর্তুগালকে টিকিয়ে রাখেন দিওগো কস্তা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ম্যাচ শেষে এই ডাবল সেভকে ম্যাচের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে পর্তুগাল।

 

৩৬ মিনিটে নুনো মেন্দেস বাম দিক দিয়ে দুর্দান্ত দৌড়ে আক্রমণ সাজান। তার ক্রস থেকে জোয়াও ফেলিক্সের হেড স্প্যানিশ ডিফেন্সে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। সেই বল রোনালদোর সামনে এলেও খুব কাছ থেকে নেওয়া তার ব্যাক-হিল ফ্লিক যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ায় সহজেই বলটি ধরে ফেলেন উনাই সিমন।

 

প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে সবচেয়ে বড় সুযোগটি তৈরি হয় পর্তুগালের।

 

৪৩ মিনিটে নুনো মেন্দেস বাম দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে জোরালো শট নেন। বলটি ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে ক্রসবারে আঘাত করে বাইরে চলে যায়।

 

সেই মুহূর্তে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ভাগ্য সহায় না হওয়ায় গোলের দেখা পায়নি পর্তুগাল।

 

প্রথমার্ধে স্পেন বল দখলে সামান্য এগিয়ে থাকলেও পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল দুই দলই। রোনালদোকে পুরোপুরি আটকে রাখতে সফল হন স্পেনের দুই সেন্টার-ব্যাক রবিন লে নরমঁ ও পাউ কুবার্সি।

 

বিশেষ করে রোনালদোকে বক্সের ভেতরে বল পাওয়ার সুযোগ খুব কমই দেওয়া হয়।

 

অন্যদিকে স্পেনের আক্রমণে সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন লামিন ইয়ামাল।

১৭ বছর বয়সী এই বিস্ময় বালক ডান প্রান্ত দিয়ে একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুলছিলেন। যদিও চূড়ান্ত পাস কিংবা ফিনিশিংয়ের অভাবে গোলের দেখা পাচ্ছিল না স্পেন।

 

বিরতির সময় দুই কোচই খেলোয়াড়দের নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তে বুঝতে পারেন, ম্যাচ জিততে হলে আরও সৃজনশীল আক্রমণ প্রয়োজন।

 

অন্যদিকে রবার্তো মার্তিনেজ তার খেলোয়াড়দের ধৈর্য ধরে খেলার নির্দেশ দেন এবং কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর জোর দিতে বলেন।

 

প্রথম ৪৫ মিনিট শেষে স্কোরলাইন ছিল ০-০।

তবে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে যে দল প্রথম ভুল করবে, সেই দলই হয়তো ম্যাচ থেকে ছিটকে যাবে।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দুই দলই কিছুটা সতর্ক ফুটবল খেলতে থাকে। প্রথম ১০ মিনিটে মাঝমাঠের দখল নিয়ে লড়াই চললেও পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি কোনো দল। তবে ধীরে ধীরে আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে স্পেন।

 

৫৪তম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় স্পেন। বলের পেছনে দাঁড়ান তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল। দারুণ বাঁকানো শটে তিনি সরাসরি গোলের চেষ্টা করেন। কিন্তু পর্তুগালের গোলরক্ষক দিওগো কস্তা অসাধারণ ডাইভ দিয়ে বলটি কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন। ম্যাচে এটি ছিল তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ।

 

কয়েক মিনিট পর পাল্টা আক্রমণে ওঠে পর্তুগাল। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে আসেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ। বক্সের ভেতরে ঢুকে শক্তিশালী শট নিলেও সেটি সাইড নেটে আঘাত করে বাইরে চলে যায়। মুহূর্তের জন্য অনেকেই ভেবেছিলেন বলটি জালে জড়িয়েছে।

 

৬২ মিনিটে স্পেনের হয়ে আরেকটি সুযোগ তৈরি করেন নিকো উইলিয়ামস। বাম দিক থেকে কাট-ইন করে নেওয়া তার শট অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়।

 

ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়াতে থাকে, দুই কোচই একের পর এক পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে মাঠে নামান ফেরান তোরেস, মিকেল মেরিনো ও দানি ওলমোকে। অন্যদিকে পর্তুগালের রবার্তো মার্তিনেজ বেঞ্চ থেকে নামান বের্নার্দো সিলভা, রাফায়েল লেয়াও ও গনসালো রামোসকে, যাতে আক্রমণে নতুন গতি আসে।

 

পরিবর্তনের পর স্পেনের আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ফেরান তোরেস মাঠে নামার পর আক্রমণভাগে গতি বাড়ে। তার বল নিয়ন্ত্রণ এবং ছোট ছোট পাস পর্তুগালের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে।

 

এদিকে ম্যাচজুড়ে রোনালদোকে কার্যত নিস্তেজ করে রাখে স্পেনের রক্ষণভাগ। পাউ কুবার্সি ও রবিন লে নরমঁ মিলে এমনভাবে মার্কিং করেন যে, বক্সের ভেতরে খুব কমবারই বল পান পর্তুগিজ অধিনায়ক। মাঝেমধ্যে নিচে নেমে বল নেওয়ার চেষ্টা করলেও কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেননি তিনি।

 

মাঝমাঠেও দারুণ আধিপত্য দেখায় স্পেন। রদ্রি, পেদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের পাসিং ফুটবল পর্তুগালকে বলের পেছনে দৌড় করায়। যদিও শেষ তৃতীয়াংশে বারবার আক্রমণ ভেস্তে যাচ্ছিল।

 

৭৮তম মিনিটে লামিন ইয়ামাল আবারও ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত একটি আক্রমণ তৈরি করেন। তার নিচু ক্রস থেকে ফেরান তোরেস শট নিলেও বল ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে কর্নার হয়ে যায়।

 

৮৩ মিনিটে পর্তুগালের সেরা সুযোগটি আসে। ব্রুনো ফার্নান্দেজের ক্রসে গনসালো রামোস হেড করলেও বলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এর কিছুক্ষণ পর বের্নার্দো সিলভার একটি ক্রস রোনালদোর নাগালের ঠিক বাইরে দিয়ে চলে যায়।

 

নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পর ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই আসে সেই নাটকীয় মুহূর্ত।

 

অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিট, অর্থাৎ ৯১তম মিনিটে মাঝমাঠ থেকে দারুণ একটি আক্রমণ গড়ে তোলে স্পেন। ফেরান তোরেস অসাধারণ একটি থ্রু পাস বাড়িয়ে দেন বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর উদ্দেশে। পর্তুগালের ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে বক্সে ঢুকে ডান পায়ের নিখুঁত নিচু শটে দিওগো কস্তাকে পরাস্ত করেন মেরিনো।

 

বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্পেন শিবির। বেঞ্চ থেকে শুরু করে গ্যালারিতে থাকা স্প্যানিশ সমর্থকদের আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম।

 

গোল হজমের পর শেষ চেষ্টা চালায় পর্তুগাল।

ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্রুনো ফার্নান্দেজের ক্রস থেকে বদলি খেলোয়াড় বের্নার্দো সিলভা হেড নেন। তবে বলটি জালের ছাদ স্পর্শ করে বাইরে চলে যায়। সেটিই ছিল পর্তুগালের শেষ সুযোগ।

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ বাঁশি বাজান রেফারি।

 

বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের খেলোয়াড়রা উল্লাসে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে পর্তুগালের ফুটবলাররা হতাশ হয়ে মাঠে বসে পড়েন। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যটি ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে।

 

ম্যাচ শেষে দীর্ঘ সময় মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন পর্তুগিজ কিংবদন্তি। সতীর্থরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও হতাশা লুকাতে পারেননি পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই তারকা। অনেক সমর্থক দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাকে সম্মান জানান।

 

৪১ বছর বয়সে এসে এটি সম্ভবত রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলার পর টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও অধরা থেকে গেল বিশ্বকাপ শিরোপা।

 

বিশ্বকাপ ইতিহাসে তিনি ৩১টি ম্যাচ খেলেছেন এবং মোট ১১টি গোল করেছেন। টানা ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার একমাত্র ফুটবলার হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন তিনি। যদিও ২০২৬ আসরে নকআউট পর্বে আর গোলের দেখা পেলেন না।

 

অন্যদিকে স্পেনের নায়ক হয়ে ওঠেন মিকেল মেরিনো। বদলি হিসেবে নেমে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে তিনি দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, এমন ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে দলকে জেতানো একজন ফুটবলারের জন্য সবচেয়ে বড় অনুভূতি।

 

স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচ শেষে বলেন, দুই দলের মধ্যেই জয়ের তীব্র ইচ্ছা ছিল। শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে খেলার পুরস্কার পেয়েছে তার দল। তিনি দিওগো কস্তার প্রশংসা করে বলেন, পর্তুগালের গোলরক্ষক না থাকলে ম্যাচের ফল আরও আগেই নির্ধারিত হতে পারত।

 

পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেন, তার দল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। তবে ফুটবলে ছোট ছোট মুহূর্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। শেষ মুহূর্তে সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে স্পেন।

 

ম্যাচের পরিসংখ্যানেও ছিল দুই দলের সমান লড়াই। বলের দখল, পাসের সংখ্যা ও আক্রমণে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। তবে সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে স্পেন ছিল বেশি কার্যকর। দিওগো কস্তা কয়েকটি অসাধারণ সেভ করে পর্তুগালকে ম্যাচে রাখলেও শেষ মুহূর্তে মেরিনোর নিখুঁত ফিনিশিং আর ঠেকাতে পারেননি।

 

এই জয়ের ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন। অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হলো একরাশ আক্ষেপ, অপূর্ণতা আর সমর্থকদের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে। তার বিদায়ের সঙ্গে শেষ হলো বিশ্ব ফুটবলের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়েরও।


সম্পর্কিত নিউজ