{{ news.section.title }}
ফ্রান্সকে স্তব্ধ করে আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ ছিল ফ্রান্সের, আর সবচেয়ে সংগঠিত রক্ষণ ছিল স্পেনের। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ধারাবাহিক দুই দল। তবে বহুল প্রতীক্ষিত এই লড়াইয়ে আক্রমণের চেয়ে রক্ষণই জিতল। দুর্দান্ত কৌশলগত ফুটবল উপহার দিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের ২-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল শুরু থেকেই বলের দখল ও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রথমার্ধের ২২ মিনিটে লামিনে ইয়ামালকে বক্সের ভেতরে ফাউল করলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) সহায়তায় পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। স্পট কিক থেকে কোনো ভুল করেননি অধিনায়ক মিকেল ওইয়ারসাবাল। ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেনিয়ানের বিপরীত দিকে বল পাঠিয়ে স্পেনকে গুরুত্বপূর্ণ লিড এনে দেন তিনি।
গোল হজমের পর ফ্রান্স ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও স্পেনের মাঝমাঠের চাপের কাছে বারবার আটকে যায় তাদের আক্রমণ। বিশ্বকাপজুড়ে দাপট দেখানো এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে ও দেজিরে দুয়ের সমন্বয়ে গড়া ফরাসি আক্রমণভাগ পুরো প্রথমার্ধে লক্ষ্যভেদী কোনো শটই নিতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধেও মাত্র দুটি শট পোস্টে রাখতে সক্ষম হয় তারা।
৫৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্পেন। দানি ওলমোর সঙ্গে দারুণ ওয়ান-টু পাসের পর ডানপ্রান্ত থেকে উঠে আসা পেদ্রো পোরো নিচু শটে মেনিয়ানকে পরাস্ত করেন। গোলটির মাধ্যমে স্পেন ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ৬৪ মিনিটে লামিনে ইয়ামাল জালেও বল পাঠিয়েছিলেন, তবে ভিএআরে অফসাইড ধরা পড়ায় গোলটি বাতিল হয়।
স্কোরলাইন ২-০ হলেও ম্যাচের প্রকৃত পার্থক্য গড়ে দেয় স্পেনের মাঝমাঠ। রদ্রির নেতৃত্বে স্প্যানিশ মিডফিল্ড ফ্রান্সের পাসিং লেন প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিং করে ফরাসিদের ভুল করতে বাধ্য করে তারা। পুরো ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ১১টি ডুয়েল জেতেন রদ্রি। পাশাপাশি ৫৯টি সফল পাস সম্পন্ন করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণও ধরে রাখেন তিনি। রক্ষণে তরুণ পাউ কুবারসি এবং রবিন লে নরমঁও ছিলেন অনবদ্য।
বিশেষভাবে নজরে ছিল ফ্রান্সের সৃজনশীল মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসেকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার পরিকল্পনা। স্পেনের সমন্বিত মার্কিংয়ের কারণে ম্যাচজুড়ে ২০ বার বলের দখল হারান ওলিসে। শেষ পর্যন্ত ৭২ মিনিটে তাকে মাঠ থেকে তুলে নিতে বাধ্য হন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম।
একইভাবে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পেও। টুর্নামেন্টে ১১টি গোলে সরাসরি অবদান রাখা ফরাসি অধিনায়ক পুরো ম্যাচে মাত্র তিনটি শট নেন, যার একটিও লক্ষ্যে ছিল না। ম্যাচের শেষদিকে হতাশা থেকে একটি হলুদ কার্ডও দেখেন তিনি।
পরিসংখ্যানও স্পেনের আধিপত্যের কথাই বলছে। ফ্রান্স ম্যাচে ৪৮৮টি পাস খেললেও স্পেনের কার্যকর প্রেসিংয়ের কারণে ৯৩টি পাস ভুল করে। ১৮টি ক্রস তুলেও মাত্র চারটিতে সতীর্থদের খুঁজে পায় দেশমের দল। অন্যদিকে স্পেন দুই উইং ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ গড়ে ফরাসি রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে এবং ম্যাচের ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখে।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই বিশ্লেষকদের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী ছিল স্পেন। অন্যদিকে গ্রুপ পর্ব ও নকআউটে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে ফ্রান্সকেও সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাস আবারও স্পেনের পক্ষেই কথা বলল। ২০২৪ ইউরো, ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগ এবং ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের পর এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও ফ্রান্সকে হারাল লা রোহারা।
এই জয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল স্পেন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আগামী রোববারের ফাইনালে তারা মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের। অন্যদিকে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় এখন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হবে দিদিয়ের দেশমের দলকে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় নিজেদের সেরা ফুটবল খেলেই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে স্পেন। এখন আর মাত্র এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন।