{{ news.section.title }}
হ্যান্ড অব গড কী, কেন ম্যারাডোনার সেই গোল বাতিল হয়নি?
ফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত গোলের অভাব নেই। কিন্তু এমন একটি গোল আছে, যার প্রভাব মাঠের ৯০ মিনিট পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং দুই দেশের সম্পর্ক পর্যন্ত। সেটি হলো দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার কিংবদন্তিতুল্য ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল।
১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই গোল করেছিলেন ম্যারাডোনা। চার দশক পেরিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফলে ফুটবল বিশ্বের আলোচনায় আবারও ফিরে এসেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ সবচেয়ে আলোচিত গোলটি।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত নিয়েই মাঠে নেমেছিল দুই দল
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর বিশ্বকাপে দেখা হয়েছিল দুই দেশের। যুদ্ধের ক্ষত তখনও তাজা। ফলে ম্যাচটি শুধু ফুটবল ম্যাচ ছিল না, বরং দুই জাতির মর্যাদা ও আবেগের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল।
ইংল্যান্ডের কাছে এটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ, আর আর্জেন্টিনার কাছে অনেকের চোখে এটি ছিল প্রতীকী প্রতিশোধের সুযোগ। সেই রাজনৈতিক আবহ ম্যাচটির গুরুত্বকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
যেভাবে জন্ম নেয় ‘হ্যান্ড অব গড’
প্রথমার্ধ গোলশূন্য শেষ হওয়ার পর ৫১তম মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তটি আসে।
নিজেদের অর্ধ থেকে আক্রমণ শুরু করেন ম্যারাডোনা। তিনি বল বাড়ান হোর্হে ভালদানোর দিকে। কিন্তু ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার স্টিভ হজ বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে উল্টো সেটি উঁচু করে নিজেদের পেনাল্টি বক্সের ভেতরে পাঠিয়ে দেন।
সুযোগ বুঝে বলের দিকে ছুটে যান ম্যারাডোনা। ইংল্যান্ডের ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে ওঠেন তিনি। উচ্চতায় পিছিয়ে থাকায় নিজের বাঁ হাত ব্যবহার করে বলটি জালে পাঠিয়ে দেন। রেফারি ও সহকারী রেফারির চোখ এড়িয়ে যায় ঘটনাটি। গোলের বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়েন ম্যারাডোনা, যদিও উদযাপনের ফাঁকে কয়েক সেকেন্ড রেফারির দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন সিদ্ধান্তটি বহাল থাকছে কি না।
ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা ঘিরে ধরেন তিউনিসিয়ার রেফারি আলী বিন নাসেরকে। বিশেষ করে অধিনায়ক পিটার শিলটন ও গ্যারি লিনেকার জোরালো প্রতিবাদ জানান। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। গোল বহাল থাকে।

‘ম্যারাডোনার মাথা, আর একটু ঈশ্বরের হাত’
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকরা গোলটি নিয়ে প্রশ্ন করলে ম্যারাডোনা দেন ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত উত্তর।
"A little with the head of Maradona, and a little with the hand of God."
বাংলায় যার অর্থ-"একটু ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর একটু ঈশ্বরের হাত দিয়ে।"
সেই একটি বাক্যই পরে গোলটির নাম হয়ে যায় "Hand of God"।
চার মিনিট পরই ‘শতাব্দীর সেরা গোল’
বিতর্কিত গোলের রেশ কাটার আগেই মাত্র চার মিনিট পর ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর গোলগুলোর একটি উপহার দেন ম্যারাডোনা।
নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একাই ড্রিবল করে পিটার বিয়ার্ডসলি, পিটার রিড, টেরি বুচার, টেরি ফেনউইক ও গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে কাটিয়ে জালে বল পাঠান তিনি।
২০০২ সালে ফিফার বৈশ্বিক ভোটে এই গোলটি "Goal of the Century" নির্বাচিত হয়। অর্থাৎ একই ম্যাচে ম্যারাডোনা করেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে প্রশংসিত-দুটি গোলই।
কেন গোলটি বাতিল হয়নি?
তৎকালীন সময়ে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR), গোললাইন প্রযুক্তি কিংবা অতিরিক্ত সহকারী রেফারি-কোনোটিই ছিল না।
মধ্যমাঠের দিকে অবস্থান করছিলেন প্রধান রেফারি আলী বিন নাসের। তিনি হ্যান্ডবলটি দেখতে পাননি। সিদ্ধান্তের আগে তিনি সহকারী রেফারি বুলগেরিয়ার বোগদান দোচেভের দিকে তাকান। দোচেভও কোনো সংকেত দেননি। ফলে গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলী বিন নাসের পরে বলেন,
"আমি আমার সহকারী রেফারির দিকে তাকিয়েছিলাম। তিনি গোলের দিকেই হাঁটছিলেন এবং কোনো হ্যান্ডবলের সংকেত দেননি। তাই আমি গোলটি দিয়ে দিই।"
অন্যদিকে বোগদান দোচেভ বহু বছর পরে বলেন, তিনি বুঝেছিলেন কিছু একটা অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু সে সময় ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সহকারী রেফারিরা প্রধান রেফারির সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না।

ইংল্যান্ডের ক্ষোভ, আর্জেন্টিনার গর্ব
ইংল্যান্ডে এই গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। সাবেক গোলরক্ষক পিটার শিলটন জীবনের শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনার সমালোচনা করেছেন এবং কখনোই তাকে এ ঘটনার জন্য ক্ষমা করেননি।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় এই গোলকে অনেকেই শুধু ফুটবলীয় চাতুর্য নয়, বরং ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর এক প্রতীকী বিজয় হিসেবেও দেখেন। সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত তথ্যচিত্র The Match-এও এই গোলকে দুই দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আজ হলে কী হতো?
বর্তমান ফুটবলে VAR, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি, একাধিক ক্যামেরা এবং বলের সেন্সরের যুগে এমন গোল টিকে থাকার কোনো সুযোগই থাকত না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভিডিও পর্যালোচনায় গোল বাতিল হয়ে যেত।
তবুও প্রযুক্তির যুগেও 'হ্যান্ড অব গড' গোলের গুরুত্ব কমেনি। বরং সেটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
৪০ বছর পর আবার সেই মহারণ
১৯৮৬ সালের সেই ম্যাচের পর বিশ্বকাপে বহুবার পথ মিলেছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের। ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড, ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের জয়-সব মিলিয়ে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।
এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে দুই ফুটবল পরাশক্তি। চার দশক আগের সেই ম্যাচে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও সবচেয়ে জাদুকরি দুই অধ্যায়। নতুন প্রজন্মের মেসি-উত্তর আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বর্তমান দল সেই ইতিহাসে নতুন কোনো অধ্যায় যোগ করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।