এআই প্রতিযোগিতায় নতুন নেতৃত্ব খুঁজছে অ্যাপল, আলোচনায় জন টার্নাস

এআই প্রতিযোগিতায় নতুন নেতৃত্ব খুঁজছে অ্যাপল, আলোচনায় জন টার্নাস
ছবির ক্যাপশান, এআই প্রতিযোগিতায় নতুন নেতৃত্ব খুঁজছে অ্যাপল, আলোচনায় জন টার্নাস

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী পদে বড় পরিবর্তন আসছে। দীর্ঘ ১৫ বছর কোম্পানির নেতৃত্ব দেওয়ার পর টিম কুক সিইও পদ ছাড়বেন। তাঁর জায়গায় অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জন টার্নাস দায়িত্ব নেবেন। আগামী ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তিনি অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সময় টিম কুক অ্যাপলের বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান হবেন।

অ্যাপলের বোর্ড সর্বসম্মতভাবে এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি উত্তরসূরি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ২০০১ সালে অ্যাপলে যোগ দেওয়া টার্নাস দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ হার্ডওয়্যার পণ্য উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাক, অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডসের মতো পণ্যের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।

 

৫০ বছর বয়সী টার্নাস এমন এক সময়ে অ্যাপলের দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বড় পরিবর্তন আনছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও নতুন ধরনের ডিভাইসে এআই এখন বড় প্রতিযোগিতার জায়গা। এই প্রতিযোগিতায় অ্যাপল তুলনামূলক ধীরগতিতে এগিয়েছে বলে বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।

 

২০১১ সালে সিরির মাধ্যমে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টকে মূলধারায় আনার ক্ষেত্রে অ্যাপল বড় ভূমিকা রাখলেও সাম্প্রতিক জেনারেটিভ এআই প্রতিযোগিতায় কোম্পানিটি এখনো বড় ধরনের সফল পণ্য দেখাতে পারেনি। অন্যদিকে এআই চিপ, চ্যাটবট ও এআইভিত্তিক সফটওয়্যার বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীরা দ্রুত এগিয়েছে। তাই আইফোনে আরও শক্তিশালী এআই সুবিধা যুক্ত করা টার্নাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

 

চলতি বছরের জানুয়ারিতে সিরিকে আরও উন্নত করতে গুগলের জেমিনি প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য অ্যাপল একটি চুক্তি করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অ্যাপলকে তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব এআই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও এআইকে একসঙ্গে নতুনভাবে সাজানোর চাপ থাকবে।

 

টার্নাস সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাপলের পণ্য উন্মোচন ও গণমাধ্যমে উপস্থিতিতে বেশি দেখা গেছেন। অ্যাপল সাধারণত শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে খুব বেশি সামনে আনে না। তাই তাঁর দৃশ্যমানতা বাড়ানোকে অনেকেই উত্তরসূরি প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছিলেন। সেপ্টেম্বরে তিনি আইফোন এয়ার প্রদর্শন করেন, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে আইফোন নকশায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়।

 

নতুন সিইও হিসেবে টার্নাসকে শুধু এআই নয়, নতুন হার্ডওয়্যার বাজারেও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। ফোল্ডিং ফোন, অগমেন্টেড রিয়েলিটি গ্লাস, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ডিভাইস এবং এআইভিত্তিক ব্যক্তিগত ডিভাইস ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি বাজারের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। অ্যাপলের ভিশন প্রো উচ্চমূল্যের কারণে সীমিত বাজারে রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক কম দামের প্রতিদ্বন্দ্বী ডিভাইস দ্রুত ব্যবহারকারীর আগ্রহ পাচ্ছে।

 

টিম কুকের সময় অ্যাপল ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রযুক্তি কোম্পানিতে পরিণত হয়। ২০১১ সালে স্টিভ জবসের পর সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় অ্যাপলের বাজারমূল্য ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক কম। কুকের নেতৃত্বে আইফোন ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয়, অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস, অ্যাপল পে, আইক্লাউড এবং সার্ভিসেস ব্যবসা কোম্পানির আয়ের বড় উৎসে পরিণত হয়। তাঁর সময়ে অ্যাপলের বাজারমূল্য প্রায় ৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

কুক অ্যাপলের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। চীনে বড় উৎপাদন নেটওয়ার্ক, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কম ইনভেন্টরি মডেলের মাধ্যমে অ্যাপল দীর্ঘ সময় উচ্চ মুনাফা ধরে রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও ভিয়েতনামে উৎপাদন বাড়ালেও চীন এখনো অ্যাপলের সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

নেতৃত্ব পরিবর্তনের অংশ হিসেবে জনি সরুজিকে অ্যাপলের চিফ হার্ডওয়্যার অফিসার করা হয়েছে। তিনি আগে থেকেই অ্যাপলের নিজস্ব চিপ ও সেন্সর ডিজাইন তদারক করছিলেন। হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এখন টম মেরিবের অধীনে থাকবে, যিনি সরুজির কাছে রিপোর্ট করবেন।

 

সব মিলিয়ে অ্যাপলের নতুন নেতৃত্ব বদল শুধু একজন সিইওর পরিবর্তন নয়। এটি কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি কৌশলেরও বড় পরীক্ষা। টিম কুক অ্যাপলকে সরবরাহ, মুনাফা ও বৈশ্বিক ব্যবসায় শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছেন। এখন জন টার্নাসের সামনে বড় কাজ হলো এআই যুগে আইফোন, ম্যাক ও নতুন ডিভাইসকে আবারও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কেন্দ্রে নিয়ে আসা।


সম্পর্কিত নিউজ