এআইয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে ৮০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করবে অ্যালফাবেট

এআইয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে ৮০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করবে অ্যালফাবেট
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা যখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, তখন এ খাতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে ৮০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান Alphabet Inc.। কোম্পানিটির ভাষ্য, এআই সেবা ও প্রযুক্তির প্রতি গ্রাহকদের ‘নজিরবিহীন’ চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং চিপভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

সোমবার (১ জুন) প্রকাশিত ঘোষণায় অ্যালফাবেট জানায়, বর্তমানে এন্টারপ্রাইজ গ্রাহক, সরকারি সংস্থা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে তাদের এআই সলিউশন ও ক্লাউডভিত্তিক সেবার চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে বিদ্যমান অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে তাই নতুন বিনিয়োগ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

 

বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এত বড় তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন-পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শেয়ার ইস্যুর ফলে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার অংশ কিছুটা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাই এই সাময়িক চাপের কারণ।

 

ওয়ারেন বাফেটের প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ

অ্যালফাবেটের ঘোষিত ৮০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ কর্মসূচির একটি বড় অংশ আসছে কিংবদন্তি বিনিয়োগকারী Warren Buffett-এর মালিকানাধীন Berkshire Hathaway থেকে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার কিনতে সম্মত হয়েছে।

বাকি ৭০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার আসবে আন্ডাররাইটেন অফারিংসের মাধ্যমে, যেখানে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগ ব্যাংক শেয়ার বিক্রিতে সহায়তা করবে। আর অবশিষ্ট ৪০ বিলিয়ন ডলার ধাপে ধাপে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি করা হবে। বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, বাফেটের প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ অ্যালফাবেটের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়াবে।

 

কেন এত বড় বিনিয়োগ?

গত দুই বছরে এআই খাতের বিস্ফোরণমূলক প্রবৃদ্ধির ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কম্পিউটিং সক্ষমতা। বড় ভাষা মডেল (LLM), জেনারেটিভ এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং এআই এজেন্ট পরিচালনার জন্য বিপুল সংখ্যক উন্নতমানের চিপ, সার্ভার এবং ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এআই প্রতিযোগিতায় শুধু সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদম নয়, বরং কার কাছে সবচেয়ে বেশি কম্পিউটিং শক্তি রয়েছে সেটিই হয়ে উঠছে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।

 

অ্যালফাবেটের প্রধান এআই সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে গুগল জেমিনি, ক্লাউড এআই প্ল্যাটফর্ম, সার্চভিত্তিক এআই ফিচার এবং বিভিন্ন এন্টারপ্রাইজ অটোমেশন সিস্টেম। এসব সেবার দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে কোম্পানির অবকাঠামোগত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

 

ব্যয় বাড়ছে শত শত বিলিয়ন ডলারে

অ্যালফাবেট জানিয়েছে, চলতি বছর তাদের মূলধনী ব্যয় (Capital Expenditure) ১৮০ থেকে ১৯০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পৌঁছাতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে এই ব্যয় আরও বাড়বে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক Goldman Sachs-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যে অ্যালফাবেট, Microsoft, Amazon এবং Meta Platforms-সহ শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে এআই-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে। এটি হবে প্রযুক্তি শিল্পের ইতিহাসে অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রবাহগুলোর একটি।

 

এআই দখলের লড়াই আরও তীব্র

আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান মার্জারমার্কেটের কর্মকর্তা ট্রয় হুপার মনে করেন, অ্যালফাবেটের এই উদ্যোগ মূলত এআই নেতৃত্বের দৌড়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার কৌশল। তার ভাষায়, “প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর জন্য কম্পিউট ক্যাপাসিটি এখন ভবিষ্যৎ আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। এআই যুগে কম বিনিয়োগ করা মানে প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়া। তাই বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সামনে এখন একটাই প্রশ্ন- কে সবচেয়ে দ্রুত ও সবচেয়ে বড় পরিসরে অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে।”

 

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এআই শিল্পে প্রতিযোগিতা শুধু গুগল, মাইক্রোসফট বা ওপেনএআইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চীনভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও দ্রুত এগিয়ে আসছে। ফলে আগামী কয়েক বছর এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ উৎপাদনে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।

 

এই প্রেক্ষাপটে অ্যালফাবেটের ৮০ বিলিয়ন ডলারের নতুন তহবিল সংগ্রহকে প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ভবিষ্যতের এআই বিজয়ী নির্ধারণ করবে শুধু উন্নত অ্যালগরিদম নয়, বরং কার হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো রয়েছে সেটিই।


সম্পর্কিত নিউজ