চীনের চাপ, ২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে মেটা

চীনের চাপ, ২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে মেটা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই বড় ধরনের একটি ব্যবসায়িক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যানুস (Manus) অধিগ্রহণের জন্য আলোচিত প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা। ইতোমধ্যে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ম্যানুসের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি অবকাঠামোতে মেটার প্রবেশাধিকারও সীমিত করা হয়েছে। ফলে একসময় সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত চুক্তিটি কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

 

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি করপোরেট অধিগ্রহণ চুক্তির ভেঙে যাওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত প্রযুক্তিগত আধিপত্যের বৃহত্তর প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।

 

বেইজিংয়ের হস্তক্ষেপের পর বদলে যায় পরিস্থিতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস আগে চীনা কর্তৃপক্ষ জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি সুরক্ষার বিষয়টি সামনে এনে ম্যানুস বিক্রির পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেয়। বেইজিংয়ের উদ্বেগ ছিল, উন্নত এআই প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেলে তা ভবিষ্যতে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

চীনের প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ডেটা অবকাঠামোর মতো খাতগুলোকে এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ম্যানুসকে ঘিরে বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, চীন এখন আর তার উন্নত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সহজে বিদেশি মালিকানার আওতায় যেতে দিতে আগ্রহী নয়।

 

মেটা কেন আগ্রহী ছিল?

মেটা দীর্ঘদিন ধরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ChatGPT-এর উত্থান, Google Gemini-এর বিস্তার এবং বিভিন্ন এআই স্টার্টআপের দ্রুত অগ্রগতির ফলে প্রযুক্তি খাতে প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে ম্যানুসকে সম্ভাবনাময় একটি এআই কোম্পানি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বিশেষ করে মাল্টি-এজেন্ট এআই সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রযুক্তি এবং উন্নত ব্যবসায়িক অটোমেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরির কারণে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মহলে আলোচনায় আসে।

 

২০২৫ সালে ম্যানুস তাদের কয়েকটি প্রযুক্তি প্রদর্শন করে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের এআই প্ল্যাটফর্ম জটিল নির্দেশনা বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম। এরপরই মেটার সঙ্গে সম্ভাব্য অধিগ্রহণ আলোচনা শুরু হয়।

 

নতুন মালিকানা কাঠামোর পথে ম্যানুস

আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ম্যানুসের সহপ্রতিষ্ঠাতারা এখন প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ধরে রাখতে নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। সূত্রগুলো বলছে, প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের নতুন অর্থায়ন সংগ্রহের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই অর্থায়নের মাধ্যমে একটি নতুন মালিকানা কাঠামো গড়ে তোলা হতে পারে, যেখানে চীনা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে।

 

এছাড়া ভবিষ্যতে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে (HKEX) তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ম্যানুস বিদেশি অধিগ্রহণের পরিবর্তে স্বাধীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।

 

প্রযুক্তি নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় ইস্যু

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি খাতকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে উন্নত চিপ, এআই প্রসেসর এবং সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি চীনে রপ্তানির ওপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে চীনও নিজস্ব প্রযুক্তি খাতকে বিদেশি প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

 

ম্যানুসকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের অধিগ্রহণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতিই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

ম্যানুসের প্রযুক্তি নিয়ে কেন এত আলোচনা?

প্রযুক্তি পর্যবেক্ষকদের মতে, ম্যানুসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট প্রযুক্তি। সাধারণ চ্যাটবটের মতো শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে এই ধরনের সিস্টেম ব্যবহারকারীর লক্ষ্য বুঝে একাধিক ধাপে কাজ সম্পন্ন করতে পারে।উদাহরণস্বরূপ, একটি এআই এজেন্ট বাজার গবেষণা করা, তথ্য সংগ্রহ করা, রিপোর্ট তৈরি করা, প্রেজেন্টেশন প্রস্তুত করা এবং নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের সুপারিশও করতে পারে। এই সক্ষমতার কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ ম্যানুসকে এআই শিল্পের সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।

 

সম্পর্ক ছিন্ন হলেও উন্নয়ন থামাচ্ছে না ম্যানুস

মেটার সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হওয়ার পরও ম্যানুস নতুন প্রযুক্তি উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিভিন্ন অনলাইন সেবা, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার এবং করপোরেট ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের সঙ্গে তাদের এআই প্রযুক্তি সংযুক্ত করার কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো এমন একটি এআই ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে ব্যবহারকারীরা একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একই বুদ্ধিমান সহকারী ব্যবহার করতে পারবেন।

 

সামনে কী হতে পারে?

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, মেটা ও ম্যানুসের এই বিচ্ছিন্নতা বিশ্ব এআই শিল্পে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, অধিগ্রহণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর আরও কঠোর নজরদারির আওতায় আসতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক কৌশলগত প্রভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

 

মেটা ও ম্যানুস এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত মন্তব্য না করলেও প্রযুক্তি বিশ্বের নজর এখন এই দুই প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি কোম্পানির ভবিষ্যৎ নয়, বরং বৈশ্বিক এআই শিল্পের দিকনির্দেশনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ