{{ news.section.title }}
চার বছরে পদ্মা সেতুতে টোল আদায় ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা এই সেতু গত চার বছরে শুধু যাতায়াত সহজ করেনি, বরং জাতীয় অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিল্প ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয় বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু। উদ্বোধনের পর থেকে চলতি বছরের ২৩ জুন পর্যন্ত সেতুটি দিয়ে আড়াই কোটিরও বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে। একই সময়ে টোল আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি ১৬ লাখ ১ হাজার ৪০০ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সফল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে পদ্মা সেতুর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
পদ্মা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাদ নিলয় এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, সেতুটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থ বিভাগ থেকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেতুর টোল থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ সেই ঋণ পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইতোমধ্যে আদায়কৃত অর্থের প্রায় অর্ধেক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু থেকে যে পরিমাণ টোল আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি রাজস্ব আয় হচ্ছে। ফলে প্রকল্পটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে যে আশঙ্কা ছিল, তা অনেকটাই দূর হয়েছে।
আরও পড়ুন: জুলাই স্মরণে টানা ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা ১১ দলীয় জোটের
টোল আদায়ের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চালুর প্রথম বছর ২০২২ সালে সেতু থেকে আদায় হয় ৪৪৬ কোটি ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৫ টাকা। ২০২৩ সালে টোল আদায় বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে আদায় হয় ৮৮৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। একইভাবে ২০২৫ সালেও টোল আদায়ের পরিমাণ ছিল ৮৮৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর ২০২৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৪৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
সেতু চালুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটেছে। একসময় ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও এখন কয়েক মিনিটেই পদ্মা নদী পার হওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় এবং ব্যয় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কৃষি, শিল্প, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
চলতি বছরের পবিত্র ঈদুল আজহার সময় পদ্মা সেতুতে একদিনে সর্বোচ্চ যানবাহন চলাচলের নতুন রেকর্ড গড়ে। গত ৫ জুন মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন সেতু পারাপার করে। ওই দিন টোল আদায় হয় ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা। পরদিন আরও ১০ হাজার ১১৮টি যানবাহন সেতু ব্যবহার করে এবং টোল আদায় হয় ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা।
এদিকে টোল ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করতে ইলেকট্রনিক টোল বা ই-টোল ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে ১২ হাজারের বেশি যানবাহন এই ব্যবস্থার আওতায় নিবন্ধিত রয়েছে। আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে টোল পরিশোধ সম্পন্ন হওয়ায় যানজট কমছে এবং সেবার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি টোল আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হচ্ছে।
শুধু সড়ক যোগাযোগ নয়, পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল চলাচল শুরু হওয়ার ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পরবর্তীতে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত সুবিধা পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রতীক। সেতুটির মাধ্যমে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চার বছরের সফল যাত্রা শেষে পদ্মা সেতু এখন দেশের উন্নয়ন ও সক্ষমতার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।