আন্তর্জাতিক অনুদানে জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষা ছড়িয়ে দিচ্ছে ‘EcoAstroBD’, পাঁচ আঞ্চলিক সেমিনারে অংশ নিল প্রায় সাড়ে চারশত শিক্ষার্থী

আন্তর্জাতিক অনুদানে জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষা ছড়িয়ে দিচ্ছে ‘EcoAstroBD’, পাঁচ আঞ্চলিক সেমিনারে অংশ নিল প্রায় সাড়ে চারশত শিক্ষার্থী
ছবির ক্যাপশান, জাগরণ ছবি

বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে সদ্য কলেজ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্ম ‘EcoAstroBD’। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা International Astronomical Union (IAU)-এর উন্নয়ন শাখা Office of Astronomy for Development (IAU-OAD) থেকে ৯,৫০০ ইউরো অনুদানপ্রাপ্ত এই প্রজেক্ট ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামে পাঁচটি আঞ্চলিক সেমিনার সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এসব সেমিনারে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির প্রায় ৪৫০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।

‘EcoAstroBD: Nurturing Knowledge, Creativity and Environmental Responsibility through Astronomy in Bangladesh’ শীর্ষক এই প্রজেক্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ সামিয়া আক্তার সামি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা সদ্য এইচএসসি উত্তীর্ণ এই তরুণী নিজ প্রচেষ্টায় জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে এই অনুদান অর্জন করেন।

 

বিশ্বব্যাপী ১৫০টিরও বেশি প্রজেক্টের মধ্য থেকে নির্বাচিত হওয়া এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানকে কেবল একটি বিষয় হিসেবে নয় বরং সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং পরিবেশ-সচেতনতা গড়ে তোলার একটি কার্যকর শিক্ষণ-উপকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

 

এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত সেমিনারগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মডেল গার্লস হাই স্কুল (শুধু ছাত্রীদের জন্য বিশেষ সেশন) এবং চট্টগ্রাম কলেজের সহযোগিতায় আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে জ্যোতির্বিজ্ঞান শেখানোর পাশাপাশি বিজ্ঞানচর্চার দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি, যেমন-অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাব, প্রতিযোগিতা, অলিম্পিয়াড ও সাইন্স ক্যাম্পে অংশগ্রহণের পথও তুলে ধরা হয়।

 

EcoAstroBD-এর সদস্য জানান, বাংলাদেশে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ এখনও সীমিত। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় EcoAstroBD স্থানীয়ভাবে উন্নত স্বল্পমূল্যের ও পরিবেশবান্ধব জ্যোতির্বিজ্ঞান কিট তৈরি ও বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি করছে।

 

প্রকল্পটিতে এককালীন সচেতনতামূলক আয়োজনের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ইন্টারঅ্যাকটিভ কর্মশালা, আকাশ পর্যবেক্ষণ, আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা এবং পরিবেশগত দায়িত্ববোধ তৈরির মাধ্যমে এটি একটি টেকসই শিক্ষামডেল গড়ে তুলতে কাজ করছে। গ্রামীণ, আধা-নগর ও নগর-সব স্তরের শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো অনুসরণ করছে।

 

শেখ সামিয়া আক্তার সামি বলেন, “আমি ছোটবেলায় জ্যোতির্বিজ্ঞান শেখার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, সুযোগ ও উপকরণ পাইনি। নিজের চেষ্টায় পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। আমি চাই, এখনকার শিক্ষার্থীরা যেন সেই অভাবের মুখোমুখি না হয়। তারা যেন শুরু থেকেই জ্ঞান, সহায়তা ও সুযোগ পায়-স্থান বা আর্থসামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন।”

 

তিনি আরও বলেন, “জ্যোতির্বিজ্ঞান শুধু মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার বিষয় নয়, এটি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, পর্যবেক্ষণ করতে শেখায় এবং পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বিজ্ঞানমনস্ক, দায়িত্বশীল এবং পরিবেশ-সচেতন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই।”

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রাপ্ত অনুদান দিয়ে পরিবেশবান্ধব অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল কীট তৈরি, সেমিনার বাস্তবায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আউটরিচ কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সমন্বয় করা হচ্ছে। স্থানীয় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রভাব নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ