{{ news.section.title }}
ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত নতুন হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কোনো সময় সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ দিতে পারেন-এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখে পেন্টাগনকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিদেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য প্রত্যাহার বা জরুরি পুনর্বিন্যাসের তালিকা হালনাগাদ করছেন। সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক ও গোয়েন্দা সদস্য তাদের জাতীয় স্মরণ দিবসের ছুটির পরিকল্পনাও বাতিল করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথ খোলা রাখলেও সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার রেখেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের ব্যক্তিগত কর্মসূচিও বাতিল করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, সরকারি কাজের কারণে তিনি এই সপ্তাহান্তে ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারবেন না। আগে তার নিউ জার্সির গলফ রিসোর্টে যাওয়ার কথা ছিল। তবে ইরান ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়ায় তিনি ওয়াশিংটনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শ্বেত ভবনের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট করেছেন। তার মতে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। এমনকি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাখার সুযোগও ইরানকে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট সব বিকল্প খোলা রেখেছেন। তাই তার যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত থাকা পেন্টাগনের দায়িত্ব।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জন র্যাটক্লিফসহ প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি ব্যর্থ হলে সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এখনো যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থেমে নেই। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে পৌঁছেছেন। তাকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময়ে কাতারের একটি প্রতিনিধি দলও তেহরানে গেছে। কাতার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথ খুঁজছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, পাকিস্তান, কাতার, মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরব-সবাই কোনো না কোনোভাবে এই সংকট সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত জটিল, তাই অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই।
বর্তমান আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা দুটি বিষয়। প্রথমটি হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। দ্বিতীয়টি হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ পরিবহন হয়। ফলে এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে, যেখানে প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলাদা আলোচনা চলবে। তবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব কর্তৃপক্ষ ও শুল্কব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে।
সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়ার বরাতে সিনহুয়া জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। ওই খসড়ায় নয় দফা থাকতে পারে। এর মধ্যে সব পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি, সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ, অর্থনৈতিক স্থাপনায় আঘাত না করা এবং প্রচারযুদ্ধ বন্ধের মতো বিষয় থাকতে পারে। তবে এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির ঘোষণা দেয়নি।
ইরানের পক্ষ থেকেও কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানের ওপর আবার হামলা চালালে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে যেতে পারে। তারা দাবি করেছে, ইরান এখনো তার সব সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেনি। প্রয়োজনে এমন জায়গায় আঘাত হানা হবে, যা আমেরিকানরা কল্পনাও করেনি।
ইসরায়েলকে ঘিরেও পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক আলোচনাকে আরেকটি সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। একাধিক সূত্র বলছে, দুই নেতার মধ্যে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে উত্তপ্ত ফোনালাপ হয়েছে। তবে শ্বেত ভবন এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
সব মিলিয়ে ইরান ইস্যুতে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশ যুদ্ধ থামাতে ও সমঝোতার পথ খুঁজতে চেষ্টা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে ইরানকে চাপে রাখছে। ওয়াশিংটনের বার্তা স্পষ্ট-চুক্তি না হলে সামরিক হামলার পথ খোলা থাকবে।
তেহরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, নতুন হামলা হলে তার জবাব সীমিত থাকবে না। ফলে আগামী কয়েক দিনই নির্ধারণ করতে পারে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবার বড় ধরনের সংঘাতের মুখে পড়বে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স