{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি দেখা দিয়েছে। সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবর সামনে আসার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। প্রধান বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নেমে এসেছে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে, যা গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতনগুলোর একটি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই ডেলিভারির ব্রেন্ট ফিউচারের দাম সোমবার (২৫ মে) গ্রিনিচ মান সময় ০১:০৫-এ প্রতি ব্যারেল ৯৮.৪৭ ডলারে দাঁড়ায়। এক মাস আগের তুলনায় এটি প্রায় ৯ শতাংশ কম, তবে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনও এক-তৃতীয়াংশের বেশি বেশি। অন্যদিকে Reuters জানিয়েছে, সোমবার এশীয় লেনদেনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুড ৪.৫৫ শতাংশ কমে ৯৮.৮৩ ডলারে এবং মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ৪.৭৩ শতাংশ কমে ৯২.০৩ ডলারে নেমে আসে। দুই ধরনের তেলের দামই ৭ মে’র পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে যায়।
চুক্তির আশায় বাজারে স্বস্তি
বাজারে এই বড় পতনের পেছনে মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে নতুন আশাবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা শান্তি কাঠামোর বেশিরভাগ বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষ হয়েছে। সম্ভাব্য চুক্তির শর্তের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত।
তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে সতর্ক সুরে বলেছেন, চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা “শৃঙ্খলাপূর্ণ ও গঠনমূলকভাবে” এগোচ্ছে, কিন্তু তিনি কর্মকর্তাদের দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে বলেননি। তার ভাষায়, দুই পক্ষকেই সময় নিতে হবে এবং সঠিকভাবে এগোতে হবে; ভুলের কোনো সুযোগ নেই। Reuters জানিয়েছে, ট্রাম্প আরও বলেছেন, চুক্তি সম্পন্ন, অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকবে।
জাপানের শেয়ারবাজারে রেকর্ড উত্থান
তেলের দাম কমার পাশাপাশি বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক নিক্কেই ২২৫ সোমবার সকালের লেনদেনে ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। আল জাজিরা জানিয়েছে, শুক্রবার সূচকটি রেকর্ড উচ্চতায় বন্ধ হওয়ার পর সোমবার আবারও নতুন উচ্চতা স্পর্শ করে।
এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে আগ্রহ বাড়তে দেখা গেছে। Reuters জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার সম্ভাবনায় তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামায় ডলার দুর্বল হয় এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। ভারতীয় শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়; নিফটি ৫০ ও সেনসেক্স সূচক সোমবার শুরুতেই এক শতাংশের বেশি বাড়ে।
হরমুজে আটকে আছে বড় সরবরাহ
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেলের দাম কমলেও মৌলিক সরবরাহ পরিস্থিতিতে এখনো বড় পরিবর্তন আসেনি। সিঙ্গাপুরভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান স্পার্টার জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহ আল জাজিরাকে বলেন, মূল পরিস্থিতিতে এখনো পরিবর্তন হয়নি; হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ১ থেকে ১.১ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
তার মতে, বাজার এখন সম্ভাব্য চুক্তির পর আটকে থাকা জাহাজগুলো থেকে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আবার বাজারে আসার আশা করছে। এই প্রত্যাশাই তেলের দাম দ্রুত নামিয়ে এনেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, চুক্তি চূড়ান্ত হলেও বাজার কিছু সময় অস্থির থাকবে এবং সবকিছু যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। উৎপাদন ও রিফাইনারি পুরোপুরি চালু করতেও সময় প্রয়োজন হবে।
যুদ্ধের পর থেকেই অস্থির জ্বালানি বাজার
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা যায়। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রাখায় বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নিজস্ব অবরোধ চালু করে, যা ওই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আরও বাধা সৃষ্টি করে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ এই পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছায়। ফলে এই প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু তেলের দাম নয়, এলএনজি, সার, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়ে।
চুক্তি হলেও দ্রুত স্বাভাবিক হবে না বাজার
বাজার বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি তেলের দামে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি আনতে পারে, তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি প্রবাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস লাগতে পারে। কারণ শুধু প্রণালি খুললেই হবে না; আটকে থাকা জাহাজ সরানো, বীমা ঝুঁকি কমানো, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত, উৎপাদন পুনরায় চালু এবং শোধনাগারগুলোতে স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
এমএসটি মারকি–এর বিশ্লেষক সল কাভোনিক রয়টার্সকে বলেন, শান্তি চুক্তি ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে এখনো অনেক ঝুঁকি ও সতর্কতার জায়গা থাকলেও বাজার অন্তত “সুড়ঙ্গের শেষে আলো” দেখতে পাচ্ছে, যা কাছাকাছি সময়ে তেলের দামে কিছুটা স্বস্তি আনবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা