চার সপ্তাহের মধ্যে বিশ্ববাজারে সর্বোচ্চ তেলের দাম

চার সপ্তাহের মধ্যে বিশ্ববাজারে সর্বোচ্চ তেলের দাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহালের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি উভয় পক্ষের হামলা-পাল্টা হামলা জোরদার হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI)-উভয় বেঞ্চমার্কের দাম চার সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার এশিয়ার লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৮ ডলারে ওঠে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৬৫ ডলার বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৭৯ ডলারে পৌঁছায়। আগের দিন ব্রেন্টের দাম ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছিল, যা ২০২০ সালের মে মাসের পর একদিনে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন।

 

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দাম বৃদ্ধির মূল কারণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দ্রুত অবনতি হওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য অনিশ্চয়তাও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।

 

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, ওমানের জলসীমায় হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ লেনে তাদের দুটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়।

 

এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রাখবে এবং যেসব দেশ এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধা নেবে, তাদের কাছ থেকে ব্যয়ের অংশীদারিত্ব প্রত্যাশা করা হবে।

 

কেসিএম ট্রেড-এর প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবরোধ এবং এর জবাবে ইরানের সামরিক পদক্ষেপ বাজারে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাঁর মতে, এখনো পুরোপুরি জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়নি, তবে দুই পক্ষের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থা গুরুতরভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, কিশ দ্বীপ ও দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

 

আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীও সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। হুথিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে বোমা হামলার জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি লোহিত সাগর বা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও হামলার ঝুঁকি বাড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।

 

এদিকে গাবেলি ফান্ডস-এর পোর্টফোলিও ম্যানেজার সাইমন ওং বলেছেন, হুথিদের হামলা যদি সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রয়টার্সের জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত কমার সম্ভাবনাও বাজারকে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে ভূমিকা রাখছে, যদিও গ্যাসোলিন ও ডিসটিলেট জ্বালানির মজুত কিছুটা বাড়তে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত দ্রুত নিরসন না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানির মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ