{{ news.section.title }}
তীব্র গরমে ইউরোপে এক সপ্তাহে স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ হাজার বেশি মৃত্যু
ইউরোপজুড়ে জুনের শেষ দিকে বয়ে যাওয়া রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে মাত্র এক সপ্তাহে স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ হাজার ৬৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইউরোপের ২৭টি দেশের সরকারি মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে ইউরোমোমো (EuroMOMO), যা ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সমর্থিত একটি মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক।
সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২২ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই সপ্তাহে ইউরোপের ২৭টি দেশে মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অতিরিক্ত মৃত্যুর মধ্যে ৯ হাজারেরও বেশি মানুষের বয়স ছিল ৬৫ বছর বা তার বেশি, যা চরম তাপপ্রবাহে প্রবীণদের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টিই আবারও সামনে এনেছে।
ডেনমার্কের স্ট্যাটেনস সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান চিকিৎসক এবং ইউরোমোমোর প্রতিনিধি লাসে ভেস্টারগার্ড বলেন, বছরের এই সময়ে এত বড় মাত্রার অতিরিক্ত মৃত্যু অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, “এই মাত্রার অতিরিক্ত মৃত্যুর সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হলো চরম তাপপ্রবাহ।” তিনি বলেন, অন্য কোনো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি বা সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা এত মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব না থাকলে জুনের শেষ সপ্তাহের এই তাপপ্রবাহ কার্যত অসম্ভব ছিল। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহ এখন আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়া আরও বাড়তে পারে এবং এর স্বাস্থ্যগত প্রভাবও আরও ভয়াবহ হতে পারে।
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম এবং পশ্চিম ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে। ইউরোমোমো দেশভিত্তিক অতিরিক্ত মৃত্যুর নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ না করলেও জানিয়েছে, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে ওই সপ্তাহে মৃত্যুহার ছিল “অত্যন্ত উচ্চ”। বেলজিয়ামের জনস্বাস্থ্য সংস্থা সায়েন্সানো জানিয়েছে, ২০০০ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে কোনো তাপপ্রবাহে এটিই সর্বোচ্চ অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই তাপপ্রবাহ শুধু জনস্বাস্থ্যের ওপর নয়, অবকাঠামো ও জনজীবনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, বহু স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং কয়েকটি দেশে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
ইউরোমোমোর বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের আগের টানা আট সপ্তাহে এই ২৭ দেশে প্রতি সপ্তাহে গড়ে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৫০০ জন কম মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু জুনের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে গিয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে আরও তথ্য আসার পর ভবিষ্যতে এই পরিসংখ্যান কিছুটা সংশোধিত হতে পারে।
এদিকে সোমবার প্রকাশিত পৃথক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বলা হয়েছে, মে ও জুনের তাপপ্রবাহে শুধু ইংল্যান্ড ও ওয়েলসেই প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন তাপজনিত কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস (Met Office) এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন পরিচালিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব মৃত্যুর ৪২ শতাংশই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে সাম্প্রতিক এই তাপপ্রবাহ আবারও প্রমাণ করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রবীণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরের বাসিন্দাদের জন্য ভবিষ্যতে আরও কার্যকর তাপপ্রবাহ-ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স