হঠাৎ অসুস্থতায় মারা গেলেন মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম

হঠাৎ অসুস্থতায় মারা গেলেন মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র লিন্ডসে গ্রাহাম আর নেই। শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় ৭১ বছর বয়সে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাঁর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে কী কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সিনেটর গ্রাহামের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “শনিবার সন্ধ্যায় স্বল্প সময়ের একটি আকস্মিক অসুস্থতার পর সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সবার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা কামনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই কঠিন সময়ে পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানানো হয়েছে।”

 

সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান এই সিনেটর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন। ২০০২ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার পর টানা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সিনেটে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন।

 

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে লিন্ডসে গ্রাহাম ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচকদের একজন। বিশেষ করে ২০১৬ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের সময় তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। তবে পরবর্তীতে দুই নেতার সম্পর্কের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে এবং গ্রাহাম ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগীদের একজন হয়ে ওঠেন। বিচার বিভাগীয় নিয়োগ, পররাষ্ট্রনীতি, অভিবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন।

 

পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের জন্য গ্রাহাম যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ইরান, রাশিয়া এবং চীনের বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নীতির পক্ষে কথা বলেছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থনের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়েও তিনি ইউক্রেন সফর করে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

 

মৃত্যুর সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের বাজেট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এছাড়া অর্থ বরাদ্দ, বিচারবিষয়ক এবং পরিবেশ ও গণপূর্তবিষয়ক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত হতো।

 

লিন্ডসে গ্রাহাম ১৯৫৫ সালের ৯ জুলাই সাউথ ক্যারোলাইনায় জন্মগ্রহণ করেন। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে সামরিক আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধি পরিষদের প্রসিকিউটরদের একজন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

 

লিন্ডসে গ্রাহাম কখনো বিয়ে করেননি। তিনি সাউথ ক্যারোলাইনার সেনেকা শহরকে নিজের স্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময় সেখান থেকেই প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

 

গ্রাহামের মৃত্যুর খবরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে একজন দেশপ্রেমিক, নিবেদিতপ্রাণ আইনপ্রণেতা এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে স্মরণ করেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনার গভর্নর হেনরি ম্যাকমাস্টারসহ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট-উভয় দলের নেতারাই তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেন এবং ইসরায়েলের কর্মকর্তারাও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

 

গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যু রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সিনেটে সাউথ ক্যারোলাইনার আসনটি শূন্য হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে সেই আসনে অন্তর্বর্তী নিয়োগ ও বিশেষ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।


সম্পর্কিত নিউজ