হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে শনিবার পর্যন্ত সময় দিল যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে শনিবার পর্যন্ত সময় দিল যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা অবিলম্বে বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য এই কৌশলগত জলপথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে ইরানকে শনিবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তেহরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে যে তারা আর কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাবে না এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়সীমা কেবল একটি কূটনৈতিক বার্তা নয়; বরং সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতি ইরানের অঙ্গীকার যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। হোয়াইট হাউস মনে করছে, হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক জাহাজে হামলা এবং নিরাপদ নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ওই সমঝোতার চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই ইরানের কাছ থেকে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি চাওয়া হচ্ছে।


বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এ নৌপথে যেকোনো ধরনের সংঘাত বা নৌচলাচলে বিঘ্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং তেলের দামের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।


মার্কিন প্রশাসনের দাবি, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার কারণে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা এবং কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে তা সীমিত করতে পারে না।


অন্যদিকে, ইরান বরাবরের মতোই দাবি করছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত উপকূলীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে ইরান ও ওমানের। তেহরানের মতে, বাইরের সামরিক শক্তির উপস্থিতিই এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত তাদের সার্বভৌম অধিকারের মধ্যেই পড়ে।


ইরান সাম্প্রতিক সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছে যে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য নতুন সার্ভিস ফি বা সেবামূলক চার্জ চালু করা হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে নিরীহ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া বা বাধ্যতামূলক টোল আরোপের বিষয়টি বিতর্কিত এবং এ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।


এদিকে কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওমান সফর করেছেন। মাসকাটে তিনি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ আলোচনা নিয়ে মতবিনিময় করবেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।


একই সময়ে কাতারও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। দোহা জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখতে চায় এবং পরিস্থিতি যেন পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ না নেয়, সে জন্য সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।


গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করে। এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ফলে কয়েক সপ্তাহ আগে হওয়া যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি খাতে দেওয়া কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পুনর্বিবেচনা করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘিত হলে অর্থনৈতিক ছাড় অব্যাহত রাখার কোনো সুযোগ নেই। তবে তেহরান বলছে, সমঝোতা ভঙ্গ করেছে যুক্তরাষ্ট্রই এবং বর্তমান সংকটের দায়ও তাদের।


বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শনিবারের সময়সীমা বর্তমান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। যদি ইরান প্রকাশ্যে নিরাপদ নৌচলাচলের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে নতুন করে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে উভয় পক্ষের অবস্থান আরও কঠোর হলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ