হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না, কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতার

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না, কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতার
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তির সামরিক কিংবা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা ও তেহরানের অন্তর্বর্তীকালীন জুমার নামাজের ইমাম হোজ্জাতোলেসলাম মোহাম্মদ হাসান আবুতোরাবি-ফার্দ। তিনি বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ সক্ষম এবং হরমুজের ব্যবস্থাপনা ইরানের সার্বভৌম অধিকারের মধ্যেই থাকবে।

শুক্রবার তেহরানে জুমার নামাজের খুতবায় আবুতোরাবি-ফার্দ বলেন, হরমুজ প্রণালি শুধু একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই এ অঞ্চলে কোনো বিদেশি শক্তির একতরফা সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তাঁর ভাষায়, ইরানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।


ইরানি এই ধর্মীয় নেতা অভিযোগ করেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতি প্রথমে প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রই একতরফাভাবে তা লঙ্ঘন করেছে। তাঁর দাবি, সামরিক পদক্ষেপ ও আক্রমণাত্মক নীতির মাধ্যমে ওয়াশিংটন আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করেছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

আবুতোরাবি-ফার্দ বলেন, এই সমঝোতা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আস্থার ভিত্তিতে করা হয়নি। বরং এটি ছিল পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক সমঝোতা। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর ইরান জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মিত্র দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় আগের চেয়ে আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।


তিনি ইরানের সেনাবাহিনী, আইআরজিসি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এসব বাহিনী শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে না, বরং পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর ভাষায়, "ইসলামী প্রজাতন্ত্র স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে, কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না।"


খুতবায় আবুতোরাবি-ফার্দ আরও দাবি করেন, গত কয়েক মাসে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন চাপ ও সামরিক তৎপরতার মুখেও ইরান নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালালেও ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সামরিক প্রস্তুতির কারণে তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। তবে এ বিষয়ে তাঁর দাবির স্বাধীন কোনো আন্তর্জাতিক যাচাই পাওয়া যায়নি।


হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিদিন এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা নৌচলাচলে বিঘ্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার কারণে এই জলপথ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা। এর মাধ্যমে তেহরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিতে চাইছে যে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে তারা কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।


খুতবার শেষাংশে আবুতোরাবি-ফার্দ ইরানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ও ধর্মীয় সমাবেশের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থন এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতিফলন। তাঁর দাবি, ইরান ও প্রতিবেশী দেশের জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিরোধ অক্ষের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।


মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো গভীর। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান আগামী দিনগুলোতে অঞ্চলটির নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ