পশ্চিম ইউরোপের তাপপ্রবাহে প্যারিসের কাছে ভয়াবহ দাবানল, পুড়েছে ৮০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি

পশ্চিম ইউরোপের তাপপ্রবাহে প্যারিসের কাছে ভয়াবহ দাবানল, পুড়েছে ৮০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিম ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরে ঐতিহাসিক ফঁতেব্লো (Fontainebleau) বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরম, শুষ্ক আবহাওয়া ও দমকা বাতাসের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে ইতোমধ্যে ৮০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে শত শত দমকলকর্মী, অগ্নিনির্বাপক বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।

ফঁতেব্লো বনাঞ্চল প্যারিস থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ফঁতেব্লো প্রাসাদের জন্য পরিচিত এই এলাকা ফ্রান্সের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার বিকেলে একটি মহাসড়কের পাশ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং সোমবার ভোর নাগাদ ৮০০ হেক্টরের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

 

আগুনের তীব্রতায় ফ্রান্সের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ এ৬ মোটরওয়ে-এর একটি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্যারিস থেকে লিয়ঁগামী উচ্চগতির ট্রেনসহ বেশ কয়েকটি রেলসেবাও ব্যাহত হয়। গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে এ পরিস্থিতি হাজারো যাত্রীর দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

 

দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায় বনসংলগ্ন লে ভদুয়ে (Le Vaudoué) গ্রামের কয়েক শ বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানায়, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

 

দাবানল নিয়ন্ত্রণে ৪০০-এর বেশি দমকলকর্মী রাতভর কাজ করেছেন। সোমবার পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে দুটি কানাডেয়ার (Canadair) জলবর্ষণকারী বিমান পাঠানো হয়। এছাড়া দুটি অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টার ও একটি পর্যবেক্ষণ বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় দমকল বাহিনী ফেডারেশনের কর্মকর্তা এরিক ব্রোকার্ডি বলেন, প্যারিস অঞ্চলের দাবানল মোকাবিলায় দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে অগ্নিনির্বাপক বিমান পাঠানোর ঘটনা নজিরবিহীন।

 

স্থানীয় কর্মকর্তারা আগুনকে ‘ব্যতিক্রমী মাত্রার’ এবং ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। লে ভদুয়ের উপ-মেয়র দিদিয়ের বুগিনে বলেন, তিন দশকের অভিজ্ঞতায় তিনি এমন ভয়াবহ দাবানল আগে কখনও দেখেননি। তাঁর ভাষায়, “আমরা আমাদের বন হারানোর শঙ্কায় আছি।”

 

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, চলতি বছর দেশটিতে দাবানলে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। তিনি বলেন, আগুনের উৎপত্তিস্থলে একাধিক আলাদা আগুন লাগার চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাই এটি ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি কর্তৃপক্ষ।

 

বর্তমানে ফ্রান্সজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে এবং বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা, কম আর্দ্রতা ও দমকা বাতাস দাবানল দ্রুত বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।

 

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপে চরম তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। ইউরোপ বর্তমানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি উত্তর ও মধ্য ফ্রান্সের মতো এলাকাতেও এখন বড় ধরনের দাবানল দেখা যাচ্ছে, যা অতীতে তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল।


সম্পর্কিত নিউজ