{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমেছে, বেড়েছে তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক আলোচনায় অচলাবস্থার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। অন্যদিকে, একই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও স্বর্ণের দাম কিছুটা কমেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়ায় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বুধবার (৩ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা তাৎক্ষণিক সরবরাহের স্বর্ণের দাম কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এদিন স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৪৬০ দশমিক ৩৬ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে আগস্টে সরবরাহের জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার মূল্য শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৪৮৮ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে আসে। এর আগের কার্যদিবসে স্বর্ণের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্বর্ণ সাধারণত যুদ্ধ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের নজর মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের দিকে চলে গেছে। উচ্চ সুদের হারের পরিবেশে স্বর্ণে বিনিয়োগের আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে কমে যায়, কারণ এই ধাতু কোনো সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না।
ওএএনডিএর সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট কেলভিন ওয়াং বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি চুক্তির জন্য চাপ দিলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না, তা নিয়ে বাজারে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত বা আরও তীব্র হলে স্বর্ণের বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও নতুন ধাক্কায় পড়তে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়েছে, সংঘাত বাড়লে স্বর্ণে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবণতা আবার বাড়তে পারে, তবে তেলের দামের প্রভাব ও সুদের হার প্রত্যাশা বাজারকে জটিল করে তুলেছে।
এদিকে বুধবার পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কয়েকটি ব্যর্থ হয়েছে অথবা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা প্রতিহত করেছে। বাহরাইন ও কুয়েতসহ অঞ্চলের মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কেশম দ্বীপে পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এই উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৫৬ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৫৬ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৬১ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ দশমিক ৩৭ ডলারে পৌঁছায়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়া এবং সরবরাহ ঝুঁকির কারণেই তেলের দামে এই ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়া শুধু জ্বালানি বাজারের বিষয় নয়; এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি, পণ্য পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরীয় জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। এই অঞ্চল দিয়ে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হয়। ফলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা বাজারে ঝুঁকি প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দেয়।
তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি মূল্যস্ফীতি নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট বেথ হ্যামাক সতর্ক করেছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার আরও বাড়ানোর বিষয় বিবেচনা করতে হতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন শ্রমবাজারের তথ্য, বিশেষ করে নন-ফার্ম পে-রোল ও কর্মসংস্থান প্রতিবেদন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ এসব তথ্য ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী নীতি সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও দরপতন দেখা গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্পট সিলভারের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। প্ল্যাটিনামের দাম কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্যালাডিয়ামের দামও শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী তেল, মূল্যস্ফীতি আশঙ্কা এবং সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা মূল্যবান ধাতুর বাজারে চাপ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার এখন একসঙ্গে কয়েকটি চাপের মুখে আছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক উত্তেজনা তেলের দাম বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সেই মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নিয়ে শঙ্কা বাড়িয়ে স্বর্ণের বাজারকে চাপের মুখে ফেলছে। ফলে স্বর্ণে সাময়িক দরপতন হলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। সংঘাত আরও তীব্র হলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা আবার বাড়তে পারে, আর যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অগ্রগতি আসে, তবে জ্বালানি ও মূল্যবান ধাতু-দুই বাজারেই নতুন সমন্বয় দেখা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স