{{ news.section.title }}
কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হামলার সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করেছে।
বুধবার (৩ জুন) মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, ইরান একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কুয়েত, বাহরাইন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তবে কোনো হামলাই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েতের দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ভেঙে পড়ে বা পথ হারিয়ে ফেলে। একই সময়ে বাহরাইনের দিকে নিক্ষেপ করা তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ও বাহরাইনের যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করে। এছাড়া আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচলরত বেসামরিক জাহাজের দিকে ছোড়া অন্তত তিনটি ড্রোনও ধ্বংস করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবে তারা কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, একটি বিমানঘাঁটি এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের (Fifth Fleet) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে সেন্টকম এসব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, মার্কিন ঘাঁটি বা পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে কোনো সফল হামলা হয়নি।
কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার পর পাল্টাপাল্টি আঘাত
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপকে কেন্দ্র করে। সেন্টকম জানিয়েছে, তারা ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ হিসেবে কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি ইরানি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন, রাডার স্থাপনা এবং ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এসব স্থাপনা থেকে ড্রোন পরিচালনা করা হচ্ছিল এবং সেগুলো আঞ্চলিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে ইরান আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর দিয়ে উড়তে থাকা একটি মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপ ও দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
আইআরজিসি দাবি করেছে, মার্কিন হামলায় হরমোজগান প্রদেশের সিরিক এলাকার একটি যোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবেই তারা মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইনের উদ্বেগ
কুয়েত সরকার জানিয়েছে, হামলার সময় দেশজুড়ে সাইরেন বাজানো হয় এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বাহরাইনও সামরিক সতর্কতা জারি করেছে। উপসাগরীয় এই দেশটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইআরজিসি ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা ইরানের স্বার্থে আঘাত এলে মার্কিন বাহিনীকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌপথ খোলা রাখা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।
শান্তি আলোচনা অনিশ্চয়তার মুখে
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক মাস ধরে যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চললেও সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা সেই প্রচেষ্টাকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এখনও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা প্রকাশ করলেও তেহরান জানিয়েছে, ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে কোনো চুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে নতুন হামলার ঘটনা প্রমাণ করছে যে সংঘাত এখন আর কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল একটি বৃহত্তর সামরিক অস্থিরতার ঝুঁকির মধ্যে প্রবেশ করছে।