{{ news.section.title }}
ফ্লোটিলা ইস্যুতে ইসরায়েলি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিবেচনায় ইইউ
গাজাগামী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি অভিযানের পর আটক যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে উসকানির অভিযোগে ইসরায়েলের কয়েকজন চরমপন্থি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয় বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জুনে অনুষ্ঠেয় ইউরোপীয় কাউন্সিলের শীর্ষ সম্মেলনের আগে প্রস্তুত করা একটি খসড়া সিদ্ধান্তে এ ধরনের পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১৮ ও ১৯ জুন অনুষ্ঠেয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ সম্মেলনের জন্য তৈরি খসড়ায় গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলাকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটক করার পর যাত্রীদের সঙ্গে করা আচরণের নিন্দা জানানো হয়েছে। খসড়ার পশ্চিম এশিয়া–সংক্রান্ত অংশে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় ইউরোপীয় কাউন্সিল উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে উসকানি দেওয়া চরমপন্থি ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
তবে এই খসড়া এখনো চূড়ান্ত নয়। ইইউর ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। শীর্ষ সম্মেলনের আগে ভাষা, প্রস্তাবের মাত্রা এবং সম্ভাব্য পদক্ষেপে পরিবর্তন আসতে পারে। ইইউর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সাধারণত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঐকমত্য প্রয়োজন হয়। তাই খসড়ায় কঠোর ভাষা থাকলেও তা সরাসরি নিষেধাজ্ঞায় রূপ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কেন নিষেধাজ্ঞার আলোচনা
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছিল গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করা একটি আন্তর্জাতিক নৌবহর। আয়োজকদের দাবি, নৌবহরটি মানবিক সহায়তা ও গাজার অবরোধের প্রতিবাদে যাত্রা করেছিল। তবে ইসরায়েলি বাহিনী নৌবহরটি আটক করে এবং শতাধিক আন্তর্জাতিক কর্মীকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
ফ্লোটিলা আটকের পর একটি ভিডিও ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্ষোভ আরও বাড়ে। ওই ভিডিওতে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে আটক কর্মীদের সামনে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ভিডিওতে কয়েকজন আটক ব্যক্তিকে হাত বাঁধা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখা যায়-এমন বর্ণনাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। এই ঘটনার পর ইউরোপের কয়েকটি দেশ, মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতারা ইসরায়েলের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন।
ইউরোপীয় কমিশনও আটক কর্মীদের সঙ্গে আচরণকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আটক প্রত্যেক ব্যক্তির নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। ফ্লোটিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের নাগরিক থাকায় বিষয়টি সরাসরি ইইউর রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
ফ্রান্স, ইতালি, আয়ারল্যান্ড ও স্পেনের চাপ
ফ্লোটিলা ইস্যুতে ইউরোপের কয়েকটি দেশ আগে থেকেই কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইতালি, আয়ারল্যান্ড ও স্পেন ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে বেন-গভিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন বলে ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ফ্রান্সও ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ ফ্লোটিলা কর্মীদের সঙ্গে ইসরায়েলি হেফাজতে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের জন্য প্রসিকিউটরদের কাছে বিষয়টি পাঠিয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, অপমানজনক আচরণ, ঠান্ডায় রাখা, পানি ও মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত করা এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগও রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ইসরায়েল অস্বীকার করেছে।
আয়ারল্যান্ডও ইইউ-নেতৃত্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির কয়েকজন নাগরিক ফ্লোটিলায় ছিলেন। আইরিশ নেতারা বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটক এবং এরপর বন্দিদের সঙ্গে আচরণের অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।
ইসরায়েলের অবস্থান
ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির দাবি, গাজার নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা ঠেকাতেই ফ্লোটিলাটি আটক করা হয়েছিল। ইসরায়েল বলেছে, আটক ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা করা হয়েছে এবং তাদের কনস্যুলার সহায়তা ও দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে বেন-গভিরের ভিডিও প্রকাশ ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও বিতর্ক তৈরি করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’আরও ভিডিও প্রকাশের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এমন ভিডিও ইসরায়েলের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। তবে বেন-গভির নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি এবং ফ্লোটিলা কর্মীদের ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞা হলে কী হতে পারে
ইইউ যদি কোনো ইসরায়েলি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তবে তা হতে পারে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ অথবা ইউরোপীয় আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ সীমিত করার মতো লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে ইইউর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য প্রয়োজন।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে ইসরায়েল নীতিতে বিভাজন আছে। কিছু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে চায়, আবার কিছু দেশ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে সতর্ক। ফলে নিষেধাজ্ঞার খসড়া সামনে এলেও তা বাস্তবে কতদূর যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইইউ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত কয়েকজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং কয়েকটি সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও উসকানির অভিযোগে ব্যক্তির ওপর লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির ইইউর রয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে
ফ্লোটিলা আটক এবং বন্দিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মানবিক সহায়তা বহনকারী নৌবহর আটক এবং এরপর কর্মীদের অপমানজনক আচরণের অভিযোগ গুরুতর। অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, গাজায় নৌ অবরোধ নিরাপত্তার কারণে প্রয়োজনীয় এবং অবরোধ ভাঙার চেষ্টা আইনত প্রতিরোধযোগ্য।
এই বিতর্কের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের খসড়া প্রস্তাব সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইইউর মধ্যে যদি ঐকমত্য তৈরি হয়, তাহলে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিকদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সহজ হবে না, কারণ ইইউর বৈদেশিক নীতিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান অনেক সময় ভিন্ন থাকে।
সব মিলিয়ে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ইস্যু এখন শুধু গাজায় মানবিক সহায়তা বা অবরোধ ভাঙার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ইউরোপ-ইসরায়েল সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং ইসরায়েলি সরকারের চরমপন্থি অংশের ভূমিকা নিয়ে বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। জুনের ইউরোপীয় শীর্ষ সম্মেলনে এ বিষয়ে কী ভাষা গৃহীত হয় এবং নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব কতদূর এগোয়-সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, রয়টার্স