যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা চুক্তিতে যেসব বিষয় থাকতে পারে

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা চুক্তিতে যেসব বিষয় থাকতে পারে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ বন্ধে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান সমঝোতা আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও ইরান ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত চুক্তি এখনো হয়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো পুরোপুরি এক নয়।

রোববার (২৪ মে) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাইও জানান, গত সপ্তাহে দুই পক্ষের অবস্থান কিছুটা কাছাকাছি এসেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি থাকলেও তাড়াহুড়া করা যাবে না। চুক্তি সম্পন্ন, অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। Reuters জানিয়েছে, ট্রাম্প আলোচনাকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বললেও কর্মকর্তাদের দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে নিষেধ করেছেন।

 

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও নয়াদিল্লিতে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি “ভালো ও কার্যকর” চুক্তি করতে চায়। তার ভাষায়, কূটনৈতিক সব পথ ব্যবহার করা হবে; তবে ভালো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র “অন্য পথে” বিষয়টি মোকাবিলা করবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুবিও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সময়সীমাবদ্ধ আলোচনার সুযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

 

প্রস্তাবিত চুক্তিতে যা থাকতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে এসব শর্ত এখনো প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়নি।

 

প্রস্তাবিত শর্তগুলো হতে পারে-

১. ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো

চলমান নাজুক যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়ানো হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে সরাসরি বড় সামরিক সংঘাত বন্ধ রেখে চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলবে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ সম্মত হলে ৬০ দিনের মেয়াদ আরও বাড়ানোও যেতে পারে।

 

২. হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া

যুদ্ধবিরতির সময়ে হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির বড় অংশ যাতায়াত করে। প্রণালিটি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ পুনরায় খোলার বিষয়টি থাকবে।

 

৩. জাহাজ চলাচলে টোল থাকবে না

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কোনো টোল আদায় করা হবে না। এটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

৪. হরমুজ থেকে মাইন অপসারণ করবে ইরান

প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে স্থাপিত মাইন অপসারণে ইরান সম্মত হতে পারে, যাতে জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারে। তবে এ বিষয়ে ইরানের আনুষ্ঠানিক পূর্ণ সম্মতি এখনো প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি।

 

৫. ইরানি বন্দর থেকে অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র

বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নিতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ইরানের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বড় বাধা তৈরি করেছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ খোলার বিনিময়ে ওয়াশিংটন ইরানি বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করতে পারে।

 

৬. ইরানের তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা ছাড়

প্রস্তাবিত চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে সীমিত পরিসরে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বৈশ্বিক বাজারে আটকে থাকা ইরানি তেলের একটি অংশ আবার সরবরাহে ফিরতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন সম্ভাবনার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে।

 

৭. পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি

চুক্তিতে ইরানের কাছ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি চাওয়া হচ্ছে যে দেশটি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি হলো-ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এমন পর্যায়ে সীমিত রাখতে হবে, যাতে তা অস্ত্র তৈরির সক্ষমতায় না পৌঁছায়।

 

৮. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে পরবর্তী আলোচনা

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য রয়ে গেছে। Reuters–কে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র বলেছেন, ইরান এখনো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরে সম্মত হয়নি এবং বিষয়টি প্রাথমিক চুক্তির অংশ নয়; বরং চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় এটি বিবেচিত হতে পারে।

 

৯. জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের সুযোগ

চুক্তির আওতায় বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়ের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। The Guardian জানিয়েছে, সম্ভাব্য কাঠামোতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জব্দ অর্থ ছাড়ের বিষয় আছে, তবে এটি ধাপে ধাপে এবং শর্তসাপেক্ষে হতে পারে।

 

১০. ৬০ দিন মধ্যপ্রাচ্যে থাকবে মার্কিন বাহিনী

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির ৬০ দিনের সময়সীমায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী অবস্থান করবে। চূড়ান্ত চুক্তি হলে পরবর্তী ধাপে সেনা প্রত্যাহারের বিষয় বিবেচনা করতে পারে ওয়াশিংটন। তবে এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ নথি এখনো প্রকাশিত হয়নি।

 

ইউরেনিয়াম ইস্যুতে বিপরীত বক্তব্য

চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। নিউইয়র্ক টাইমস যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, প্রস্তাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে রয়টার্স–এর আলাদা প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র বলেছেন, ইরান এখনো মজুত ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে সম্মত হয়নি। এর আগে রয়টার্স আরও জানিয়েছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্দেশ দিয়েছেন যে দেশটির প্রায় অস্ত্রোপযোগী মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না। তবে একই প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে ওই মজুত নিম্নমাত্রায় রূপান্তরের মতো বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

 

এ কারণে চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও পারমাণবিক ইস্যু এখনো সবচেয়ে বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে ফেলুক বা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে আনুক, যাতে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা না থাকে। অন্যদিকে ইরান বলছে, বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের আছে।

 

ইরানের অনুমোদন এখনো বাকি

সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন এখনো প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তারা অগ্রগতির কথা বললেও চুক্তির চূড়ান্ত রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়া এটি কার্যকর হবে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় ও ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোও সতর্ক ভাষা ব্যবহার করছে। কিছু ইরানি সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো বাধা দিচ্ছে-বিশেষ করে জব্দ অর্থ ছাড়, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রশ্নে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বাস্তব ছাড় দিতে হবে।

 

হরমুজ প্রণালি: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠাতে এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের আগে বিশ্বে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত।

 

যুদ্ধের পর থেকে প্রণালিটি কার্যত অচল বা সীমিত হয়ে পড়ায় জ্বালানি বাজারে বড় অস্থিরতা দেখা দেয়। সম্ভাব্য চুক্তির খবরের পর তেলের দাম কমতে শুরু করেছে, কারণ বাজার আশা করছে হরমুজ খুললে আটকে থাকা জাহাজ ও তেল সরবরাহের একটি অংশ আবার বাজারে ফিরবে।

 

বাজারে স্বস্তি, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি

সম্ভাব্য চুক্তির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির আশায় ব্রেন্ট ক্রুড ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, চুক্তি হলেও তেল সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। কারণ হরমুজ খুলে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন, বীমা, রিফাইনারি ও জাহাজ চলাচল আগের অবস্থায় ফিরবে না।


সম্পর্কিত নিউজ