{{ news.section.title }}
যুদ্ধবিরতি কার্যকরে একমত ইসরায়েল ও লেবানন
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতাকে আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পরিবেশকেও কিছুটা ইতিবাচক করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, নতুন সমঝোতা অনুযায়ী ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে তাদের সদস্য ও সামরিক অবকাঠামো সরিয়ে নেবে। পাশাপাশি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন কোনো রকেট, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বিরত থাকবে। এর বিনিময়ে ইসরায়েলও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান না চালানোর বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমানো এবং সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে এই সমঝোতা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, এটি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তবে এর আগেও গত মাসে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সীমান্ত এলাকায় গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযান অব্যাহত ছিল। চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। তেল আবিবের দাবি ছিল, ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছিল।
এদিকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরানের হামলায় কুয়েতের একটি বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনী অভিযান পরিচালনা করেছে, যা নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ফ্রন্টে সংঘাত কমানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরান আগেই সতর্ক করেছিল, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ব্যাহত হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন সক্রিয়ভাবে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বুধবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে একটি চলন্ত গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহর ছোড়া বলে সন্দেহ করা একটি ড্রোন আকাশেই ভূপাতিত করেছে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Abbas Araghchi সতর্ক করে বলেছেন, বৈরুতে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানো হলে ইরান ‘উপযুক্ত ও কঠোর’ জবাব দেবে। তার এই মন্তব্যের পরও সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা গেলে তা শুধু ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, উভয় পক্ষের আস্থা সংকট এবং মাঠপর্যায়ের সংঘর্ষ পুরোপুরি বন্ধ না হলে এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স