‘মার্কিন সেনা না মরলে যুদ্ধ নয়’-ইরান নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা

‘মার্কিন সেনা না মরলে যুদ্ধ নয়’-ইরান নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দফায় দফায় সামরিক সংঘর্ষ সত্ত্বেও বৃহত্তর যুদ্ধ এড়ানোর কৌশলেই এগোতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, সিএনএন, অ্যাক্সিওস ও রয়টার্সের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের হামলায় সরাসরি কোনো মার্কিন সেনা নিহত না হলে এই মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে নন ট্রাম্প। বরং কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সীমিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার সমন্বয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে ওয়াশিংটন।

বড় যুদ্ধ নয়, নিয়ন্ত্রিত চাপের কৌশলে ট্রাম্প

মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্রের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা বেড়ে গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখনো সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে দিতে চায় না। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে যে, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়।

 

কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সীমিত হামলা কিংবা আঞ্চলিক উত্তেজনা কিছু সময় সহ্য করেও বৃহত্তর সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার নীতিতে রয়েছে ওয়াশিংটন। তবে কোনো মার্কিন সেনা নিহত হলে বা বড় ধরনের মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

 

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে চাপ

চলতি সপ্তাহে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের পক্ষ থেকে কুয়েত, বাহরাইন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তোলে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় একাধিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

 

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ঝুঁকি বিবেচনায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং বীমা ব্যয়ও বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু তেলের দাম নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

 

কূটনৈতিক অচলাবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসন

হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করছে যে ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং একটি নতুন সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই এ বিষয়ে মতভেদ দেখা যাচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, তেহরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক চাপ দিয়ে দ্রুত ছাড় আদায় করা কঠিন হবে।

 

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সিনিয়র ফেলো স্টিভেন কুক বলেন, ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, তারা কোনো চাপের মুখে আলোচনায় বসবে না এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা ছাড়া নতুন কোনো চুক্তিতে আগ্রহী নয়।

 

নির্বাচনী বছরেও যুদ্ধ এড়াতে চাইছেন ট্রাম্প

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনের আগে ট্রাম্প এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না, যা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন একটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তার রাজনৈতিক মিত্রদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।

 

গত বুধবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত বর্তমান অবরোধ ও চাপ প্রয়োগের নীতি অন্তত সেপ্টেম্বরের ‘লেবার ডে’ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশাও ব্যক্ত করেন।

 

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি এখনো অস্থির রয়ে গেছে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোর অবস্থান ঘিরে নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও অঞ্চলটি এখনো সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

 


সম্পর্কিত নিউজ