{{ news.section.title }}
স্থানীয় নির্বাচনে আসছে বড় সংস্কার, নতুন পরিকল্পনায় ইসি
চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার নিষিদ্ধ, ইভিএম ব্যবহার না করা, পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা বাতিল, নির্দলীয়ভাবে ভোট আয়োজন, প্রার্থীদের জামানত বাড়ানো এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থিতা নিয়ে নতুন শর্ত যুক্ত করার বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালায় পরিবর্তনের কাজ চলছে। ঈদের পর সংশোধিত বিধিমালা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। কমিশন জুন মাসের মধ্যেই এ সংক্রান্ত কাজ শেষ করতে চায়। এরপর ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনার কথা বলা হলেও নির্বাচন কমিশন বছরের শেষ দিকে ভোট শুরু করতে বেশি আগ্রহী। কমিশনের ধারণা, বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোট আয়োজন কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে হাওর, উপকূলীয় ও নদীবেষ্টিত অঞ্চলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে নির্বাচন পরিচালনায় লজিস্টিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাই অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরু থেকে নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের সামনে এবার বড় পরিসরের কাজ রয়েছে। দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৫০০টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। একসঙ্গে এতগুলো নির্বাচন করা সম্ভব না হওয়ায় ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করছে কমিশন।
নতুন বিধিমালায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার বন্ধ রাখার বিষয়ে ইসি নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও কাগজের পোস্টার না রাখার মাধ্যমে ব্যয় কমানো, পরিবেশ দূষণ রোধ এবং নির্বাচনি সহিংসতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। প্রার্থীরা বিকল্প প্রচারণা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন, তবে প্রচারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আচরণবিধি আরও স্পষ্ট করা হতে পারে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার না করার পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল হতে পারে। দেশের ভেতরে বা বাইরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের একটি হতে পারে দলীয় প্রতীক বাতিল করে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজন। এতে প্রার্থীরা দলীয় পরিচয়ে নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নেবেন। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে কমিশন।
প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে কত টাকা জামানত নির্ধারণ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তুলে দিলে প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে জামানত বাড়ানো প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া ফেরারি আসামিদের প্রার্থী হতে না দেওয়ার বিষয়েও বিধিতে পরিবর্তন আসতে পারে। কমিশন মনে করছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের আইনি অবস্থান স্পষ্ট থাকা জরুরি। এতে নির্বাচনি পরিবেশ ও প্রার্থীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণত বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সংঘাতপ্রবণ হয়ে থাকে। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কমিশন সতর্ক। আপাতত সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই। ধাপে ধাপে নির্বাচন হওয়ায় পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো এলাকায় পরিস্থিতি বেশি অবনতি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল, পরিবেশবান্ধব, নিরপেক্ষ ও সংঘাতমুক্ত করা। তবে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রার্থীদের সহযোগিতা ছাড়া এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু ভোটের আয়োজন নয়; বরং নির্বাচন ব্যবস্থায় নতুন সংস্কার বাস্তবায়নের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে যাচ্ছে।