{{ news.section.title }}
এটিসি টাওয়ারে সুরক্ষিত হচ্ছে আকাশপথ, বাড়ছে রাজস্ব আয়
দীর্ঘ অপেক্ষার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার ও রাডার ব্যবস্থা এখন দেশের আকাশপথ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনছে। নতুন প্রযুক্তি চালুর ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের পুরো আকাশসীমা নজরদারির আওতায় এসেছে, অন্যদিকে বিদেশি উড়োজাহাজের আকাশসীমা ব্যবহারের ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ফ্লাইং ওভার চার্জ বাবদ আদায় হয়েছিল ১৫৭ কোটি ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬০ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটি ৫৩ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ টাকায়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তা আরও বেড়ে হয়েছে ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এটিসি টাওয়ার ও রাডার সিস্টেম চালুর পর দেশের আকাশসীমা দিয়ে যাতায়াত করা উড়োজাহাজগুলো আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। আগে পুরোনো রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের ওপর দিয়ে যাওয়া কিছু ফ্লাইট নজরদারির বাইরে থেকে যেত। ফলে নির্ধারিত ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায়ে ঘাটতি ছিল।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, নতুন এটিসি টাওয়ার চালুর পর থেকে ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায় বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের আকাশসীমা শতভাগ নজরদারির আওতায় এসেছে। ফলে কোনো ফ্লাইট রাডার ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করতে পারবে না।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, অত্যাধুনিক এই ব্যবস্থা শুধু রাজস্ব আদায়েই নয়, বিমান চলাচলের নিরাপত্তায়ও বড় ভূমিকা রাখছে। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা রিয়েল-টাইম তথ্য পাচ্ছেন। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, ফ্লাইট মনিটরিং, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট এবং বিমান ওঠানামা আরও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় এস-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডার এবং মোড-এস সেকেন্ডারি সার্ভেল্যান্স রাডার স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমা ছাড়াও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ফ্লাইট নজরদারি ও যোগাযোগ সক্ষমতা বেড়েছে। পাশাপাশি কলকাতা ও ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস ইন্টার-ফ্যাসিলিটি ডেটা কমিউনিকেশন বাস্তবায়নের পথও তৈরি হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় পাইলটদের সঙ্গে শুধু ভয়েস যোগাযোগ নয়, আধুনিক ডেটা ও স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে। এতে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হবে এবং আঞ্চলিক আকাশপথ ব্যবস্থাপনা আরও সমন্বিত হবে।
এর আগে বাংলাদেশের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। সীমিত রাডার কভারেজের কারণে দেশের পুরো আকাশসীমা কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব ছিল না। অথচ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে চলাচলকারী বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে।
প্রকল্পটির উদ্যোগ নেওয়া হয় কয়েক বছর আগে। ফরাসি প্রতিষ্ঠান থ্যালেসের প্রযুক্তি সহায়তায় এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, কমিউনিকেশন, নেভিগেশন ও সার্ভেল্যান্স ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয়। প্রকল্পটি জি-টু-জি ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৭৩০ কোটি টাকা ধরা হলেও পরবর্তীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯৪২ কোটি টাকায়।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এটিসি টাওয়ার ও রাডার ব্যবস্থা বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে দক্ষ জনবল তৈরি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
সব মিলিয়ে নতুন এটিসি টাওয়ার বাংলাদেশের বিমান খাতে নিরাপত্তা, নজরদারি ও রাজস্ব তিন ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সুরক্ষিত আকাশপথের পাশাপাশি ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায় বাড়ায় দেশের আকাশসীমা এখন আরও কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে।