{{ news.section.title }}
মোটরসাইকেল-অটোরিকশায় অগ্রিম আয়কর থাকছে না
মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আদায়ের পরিকল্পনা থেকে পিছু হটেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ব্যবহার, দৈনন্দিন যাতায়াত এবং জীবিকানির্ভর এই দুই ধরনের বহুল ব্যবহৃত যানবাহনের ওপর আপাতত কোনো নতুন অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হচ্ছে না।
সাধারণ মানুষের ওপর করের বাড়তি চাপ কমানো এবং নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ভোগান্তি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র বলছে, প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে প্রথমে করের হার কমানোর চিন্তা করা হলেও শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অগ্রিম আয়কর না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে অগ্রিম আয়করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। রাজস্ব বাড়ানো ও করজাল সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এ প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী, রাইড শেয়ার চালক, ডেলিভারি কর্মী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে যুক্ত নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
প্রতিবাদে সরব হন মোটরসাইকেল চালকরা
গত মে মাসের ১২ তারিখে গণমাধ্যমে মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সামনে মোটরসাইকেল চালকরা মানববন্ধন করেন এবং এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।
তাদের দাবি ছিল, বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন আর শুধু শখের বাহন নয়। এটি দৈনন্দিন যাতায়াত, জীবিকা এবং সময় বাঁচানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাজধানীসহ বড় শহরে যানজট এড়াতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিক্রয় প্রতিনিধি, রাইড শেয়ার চালক, খাবার ও পণ্য ডেলিভারি কর্মীরা মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করেন। অনেক নারীও নিরাপদ ও স্বাধীন যাতায়াতের জন্য ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন।
মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের যুক্তি, তারা এরই মধ্যে নিবন্ধন ফি, রোড ট্যাক্স, বীমা, জ্বালানির ওপর কর এবং বিভিন্ন সরকারি ফি পরিশোধ করছেন। এর সঙ্গে নতুন করে অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের কাছ থেকেও বাধ্যতামূলক অগ্রিম আয়কর নেওয়া হলে তা অন্যায্য হবে বলে দাবি করেন তারা।
কী ছিল প্রস্তাবিত করহার
প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১০ সিসি বা তার কম ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল অগ্রিম আয়করের বাইরে রাখা হতে পারে। তবে ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে বছরে ২ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারণের পরিকল্পনা ছিল।
পরবর্তীতে প্রতিবাদ ও জনভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই হার কমিয়ে যথাক্রমে ১ হাজার, ৩ হাজার ও ৫ হাজার টাকা করার আলোচনা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেল থেকে অগ্রিম আয়কর নেওয়ার পরিকল্পনাই বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত বহাল থাকতে পারে। বিশেষ করে ১৫০ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের মালিকদের করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। উচ্চমূল্যের মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের করজালে আনা এবং আয়-সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের যুক্তি থেকেই এ ধরনের শর্ত বিবেচনা করা হচ্ছে।
কত রাজস্ব আসতে পারত
এনবিআর সূত্রের হিসাবে, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে অগ্রিম আয়করের আওতায় আনা গেলে সরকার বছরে অন্তত ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব পেতে পারত।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০। সংস্থাটির কাছে সিসিভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না থাকলেও ১১০ সিসি বা তার নিচের মোটরসাইকেলের সংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখ ধরে হিসাব করলে করযোগ্য মোটরসাইকেলের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ লাখ।
এই ৩৮ লাখ মোটরসাইকেল থেকে গড়ে ৪ হাজার টাকা করে অগ্রিম আয়কর আদায় করা গেলে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারত। তবে ব্যবহারকারী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও জীবিকানির্ভর যানবাহনের ওপর নতুন কর আরোপ করলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিত।
বর্তমানে মোটরসাইকেলে কী খরচ আছে
বর্তমানে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এককালীন নিবন্ধন ফি এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ৫০ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি ৯ হাজার ২৯১ টাকা। এরপর প্রতি দুই বছর পরপর ১ হাজার ১৫০ টাকা রোড ট্যাক্স দিতে হয়।
১২৫ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি ১১ হাজার ৭৬৪ টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রতি দুই বছর পরপর ২ হাজার ৩০০ টাকা রোড ট্যাক্স দিতে হয়। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের দাবি, এসব খরচের সঙ্গে নতুন করে বার্ষিক অগ্রিম আয়কর যুক্ত হলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর বড় চাপ তৈরি হতো।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার করও বাতিল
মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও অগ্রিম আয়করের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে বছরে ৫ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ হাজার টাকা কর নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তবে এই করও বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দেশের শহর, উপজেলা, পৌরসভা ও গ্রামীণ এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকার অন্যতম বড় মাধ্যম। চালক, মালিক, গ্যারেজ, ব্যাটারি চার্জিং, যন্ত্রাংশ, মেরামত ও স্থানীয় পরিবহন খাতে লাখো মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক সরকারি হিসাব নেই। নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় রাজধানীসহ সারা দেশে কত অটোরিকশা চলছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, দেশে অন্তত ৩০ থেকে ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে রাজধানীতেই ১০ থেকে ১৫ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে বলে বিভিন্ন মহলের ধারণা।
বর্তমানে কোন যানবাহনে অগ্রিম আয়কর আছে
বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, জিপ, বাস, ট্রাক, পিকআপ, হিউম্যান হলার ও থ্রি-হুইলারের মতো যানবাহনের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর নেওয়া হয়। বিআরটিএ ফিটনেস নবায়ন বা সংশ্লিষ্ট সেবার সময় এসব কর আদায় করে থাকে।
বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ২ হাজার ৫০০ টাকা। সিসিভেদে প্রাইভেট কার ও জিপে এই কর ২৫ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। দোতলা বাস, এসি মিনিবাস ও কোস্টারের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা, ৫২ আসনের বেশি বাসে ২৫ হাজার টাকা এবং এর কম আসনের বাসে ২০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। এসি বাসের ক্ষেত্রে কর ৫০ হাজার টাকা এবং নন-এসি মিনিবাস বা কোস্টারের ক্ষেত্রে ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
এ ছাড়া ৫ টনের বেশি ধারণক্ষমতার ট্রাক, লরি ও ট্যাংকলরির ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা, দেড় থেকে ৫ টন পর্যন্ত যানবাহনের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার টাকা এবং দেড় টনের কম ওজনের যানবাহনের ক্ষেত্রে ৭ হাজার ৫০০ টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার ও থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রেও ৭ হাজার ৫০০ টাকা কর নির্ধারিত রয়েছে।
তবে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আগে কখনো এ ধরনের অগ্রিম আয়কর ছিল না। ফলে নতুন করে এ কর আরোপের পরিকল্পনা সামনে আসতেই ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
মোটরসাইকেল শিল্পে প্রভাবের আশঙ্কা ছিল
বাংলাদেশে গত এক দশকে মোটরসাইকেল শিল্পে বড় বিনিয়োগ হয়েছে। হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, বাজাজ, টিভিএসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড দেশে সংযোজন ও উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ খাতে কারখানা, ডিলারশিপ, সার্ভিস সেন্টার, যন্ত্রাংশ ব্যবসা, রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবা মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে মোটরসাইকেলের বিক্রি ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত। বিশেষ করে ১২৫ থেকে ১৬৫ সিসির জনপ্রিয় সেগমেন্টে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এতে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারত।
মোটরসাইকেল শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ক্রেতারা মোটরসাইকেল কেনার সময়ই ভ্যাট, শুল্ক, নিবন্ধন ফি ও অন্যান্য চার্জ দেন। এর ওপর প্রতি বছর অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে অনেক ক্রেতা নতুন মোটরসাইকেল কেনা থেকে বিরত থাকতে পারতেন। এতে শিল্প খাত, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় বাজার-সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।
করজাল বাড়ানো বনাম জনভোগান্তি
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, দেশের রাজস্ব আদায় বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় সরকার বিভিন্ন খাতে করজাল সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনাও সেই চিন্তা থেকেই এসেছিল।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করজাল সম্প্রসারণ জরুরি হলেও তা হতে হবে যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত এবং আয়ের সক্ষমতার ভিত্তিতে। মোটরসাইকেলের মালিক সবাই উচ্চ আয়ের মানুষ নন। অনেকেই রাইড শেয়ারিং, ডেলিভারি, বিক্রয় প্রতিনিধি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। তাদের ওপর একইভাবে কর চাপালে তা সামাজিকভাবে অযৌক্তিক হতে পারে।
মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অগ্রিম আয়কর বাতিলের সিদ্ধান্ত সাধারণ ব্যবহারকারী, রাইড শেয়ার চালক, ডেলিভারি কর্মী, নিম্ন আয়ের অটোরিকশা চালক এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো সামনে রেখে ভবিষ্যতে আলাদা নীতিমালা আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড