পে-স্কেলের প্রথম ধাপে কারা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন?

পে-স্কেলের প্রথম ধাপে কারা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন?
ছবির ক্যাপশান, ফাইল ছবি

আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তবে এবার বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই প্রথম ধাপে তাদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানো প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের জন্য বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হতে পারে। অন্যদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও বাড়বে, তবে সেই বৃদ্ধি অপেক্ষাকৃত কম হারে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

গত ১৮ জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন পে-স্কেল আনুষ্ঠানিক এজেন্ডায় না থাকলেও আলোচনার একপর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৈঠকে উপস্থিত এক প্রতিমন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, নতুন বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে তিন অর্থবছরে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

 

তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার আলোকে সরকার পর্যায়ক্রমে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। প্রথম ধাপে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় তাদের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যরা ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন।

 

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বেতন বৃদ্ধি মানেই সরকারের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়া। কিন্তু একই হারে রাজস্ব আয় বাড়ার নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে কম আয়ের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। তাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় উচ্চ বেতনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনায় নিম্ন বেতনের কর্মচারীদের বেশি হারে বেতন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

প্রাথমিকভাবে সরকার পরিকল্পনা করেছিল, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন যতটা বাড়বে তার ৫০ শতাংশ প্রথম দুই অর্থবছরে এবং অবশিষ্ট সুবিধা ও ভাতার অংশ শেষ অর্থবছরে প্রদান করা হবে। তবে এখন সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রস্তাবে গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-৯ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির ৪০ শতাংশ প্রথম বছরেই কার্যকর করা হতে পারে। অন্যদিকে গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ প্রথম ধাপেই দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।

 

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করা হয়। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

 

প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

 

এদিকে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য পৃথকভাবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন-২০২৫ও তাদের সুপারিশমালা প্রস্তুত করেছে। এসব প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে আগামী মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ২০টি গ্রেড বিদ্যমান। এর মধ্যে বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাধারণত ৯ম গ্রেডে চাকরিতে প্রবেশ করেন। অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীরা নিয়োগ পেয়ে থাকেন।

 

সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরে গত ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী জানান, দেশে বর্তমানে সরকারি চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

 

তাদের মধ্যে গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-৯ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার ৭৭৩ জন। আর ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরত রয়েছেন ১২ লাখ ৬০ হাজার ১১৮ জন।

 

শ্রেণিভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় শ্রেণিতে কর্মরত রয়েছেন ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৬ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৫ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪ লাখ ৪ হাজার ৫৫৭ জন এবং অন্যান্য শ্রেণিতে কর্মরত আছেন ৭ হাজার ৯৮০ জন।

 

নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও সরকারের সর্বশেষ ভাবনায় নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে আগামী জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া প্রথম ধাপের বেতন বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীরা।


সম্পর্কিত নিউজ