শ্রমবাজার থেকে বিনিয়োগ, মালয়েশিয়া সফরে কী বার্তা দিলেন তারেক রহমান?

শ্রমবাজার থেকে বিনিয়োগ, মালয়েশিয়া সফরে কী বার্তা দিলেন তারেক রহমান?
ছবির ক্যাপশান, মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন অগ্রাধিকার স্পষ্ট করলেন তারেক রহমান। সংক্ষিপ্ত সফর হলেও শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রায় সব বড় ইস্যুই এসেছে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের আলোচনায়।

২২ জুন পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একান্ত বৈঠক, সীমিত পরিসরের বৈঠক এবং পরে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সফর শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন বলেন, মাত্র ১৮ ঘণ্টার এই সফর ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার বিষয়ে দুই সরকারপ্রধান দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

 

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির রাজার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দ্রুত শ্রমবাজার চালু, কম অভিবাসন ব্যয়, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি যেসব বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থায় আছেন বা কারাগারে রয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে মানবিক ও সহানুভূতিশীল সমাধানের অনুরোধ জানানো হয়।

 

বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, এফটিএ, নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন সুযোগ তৈরিতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়। হালাল শিল্পে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে হালাল পণ্য, সনদব্যবস্থা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

 

ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। শিক্ষা খাতে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়ে দুই সরকারপ্রধান একমত হন। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।

 

সফরে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সমন্বয় এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। জ্বালানি খাতে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মালয়েশিয়ার সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

 

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ, আরসিইপিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতেও দুই দেশ আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কাজ করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

 

এই সফরে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে দুটি এক্সচেঞ্জ অব নোটস বিনিময় করা হয়েছে। সফরকালে পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া ও এমএমসি পোর্টের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন।

 

মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন বলেন, এই সফর শুধু রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তাঁর মতে, আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো আগামী দিনে দুই দেশের জন্য বহুমাত্রিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
 


সম্পর্কিত নিউজ