{{ news.section.title }}
বৃষ্টির পরও ঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’, দূষণে বিশ্বে তৃতীয় রাজধানী
রাজধানীতে কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও ঢাকার বায়ুদূষণ কমছে না। বরং মে মাসে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরও বাতাসের মান উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। রোববার সকালে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের সূচকে সকাল সোয়া আটটার দিকে ঢাকার বায়ুমান ছিল ১৫৫, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত।
আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টার দিকে ঢাকার AQI ছিল ১৫৩ এবং বাতাসের প্রধান দূষক ছিল PM2.5। এ সময় ঢাকার বাতাসে PM2.5-এর ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৫৯ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশনার তুলনায় প্রায় ১১ দশমিক ৮ গুণ বেশি। এমন মানে সাধারণ মানুষও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন, আর শিশু, বয়স্ক, শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্রোগে আক্রান্তদের ঝুঁকি আরও বেশি।
গত কয়েক দিন ঢাকায় বৃষ্টি হলেও বাতাসের মানে প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যায়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও জনভোগান্তিও তৈরি হয়।
এর আগে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত ঢাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তারিফুল ইসলাম নেওয়াজের বরাতে বলা হয়, ওই সময়ে মাত্র ছয় ঘণ্টায় ঢাকায় ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল।
সাধারণত বৃষ্টি হলে বাতাসের ধুলাবালি ও ক্ষুদ্র কণা কিছুটা নিচে নেমে আসে। ফলে সাময়িকভাবে বায়ুমান ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে এবার তা যথেষ্ট হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, বৃষ্টি হলেও রাজধানীর দূষণের উৎস বন্ধ হয়নি। নির্মাণকাজ, রাস্তার ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানা, ইটভাটা, আবর্জনা পোড়ানো এবং নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে প্রতিদিন নতুন করে দূষণ তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টির পর আর্দ্রতা বেশি থাকলে বাতাসে কণার আচরণ বদলাতে পারে এবং দূষণ দ্রুত ছড়িয়ে না গিয়ে নিচু স্তরে আটকে থাকতে পারে। তৃতীয়ত, বাতাসের গতি কম থাকলে দূষিত কণা শহরের ভেতরেই জমে থাকে।
আইকিউএয়ারের রিয়েল-টাইম ডেটায় দেখা যায়, রোববার সকাল ৯টার দিকে ঢাকায় বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটার এবং আর্দ্রতা ছিল ৭৪ শতাংশ। কম বায়ুপ্রবাহের কারণে দূষিত কণা সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। ফলে বৃষ্টি হলেও বায়ুদূষণ দ্রুত নিরাপদ মাত্রায় নেমে আসছে না।
রোববার সকালে দূষণের তালিকায় ঢাকার ওপরে ছিল পাকিস্তানের লাহোর ও ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মধ্যেও দূষণের মাত্রায় পার্থক্য দেখা যায়। উত্তর বাড্ডার আবদুল্লাহবাগ এলাকায় বায়ুমান ২০২-এ পৌঁছায়, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের কাছাকাছি। এরপর পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ী, ধানমন্ডি, গুলশান, দক্ষিণ পল্লবী ও গুলশান লেক পার্কের মতো এলাকাতেও বাতাসের মান খারাপ ছিল।
ঢাকার বায়ুদূষণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে ধুলা, নির্মাণকাজ ও যানবাহনের ধোঁয়া দূষণ বাড়ায়। আবার বর্ষার আগের সময়ে কালবৈশাখী ও বৃষ্টি দূষণ কিছুটা কমালেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ দূষণের উৎসগুলো সক্রিয় থাকলে বৃষ্টি সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরদিন বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দূষণ আবার বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমান বায়ুমানের কারণে আইকিউএয়ার ঢাকাবাসীকে কয়েকটি সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। বাইরে গেলে মাস্ক পরা, বাইরে গিয়ে ব্যায়াম না করা, ঘরের জানালা বন্ধ রাখা এবং সম্ভব হলে ঘরে বায়ু পরিশোধক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদ্রোগ বা ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্তদের অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়াই ভালো।
চিকিৎসকদের মতে, এমন দূষিত বাতাসে দীর্ঘ সময় থাকলে কাশি, গলা জ্বালা, চোখে জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং অ্যালার্জির সমস্যা বাড়তে পারে। যারা আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। তাই স্কুলগামী শিশু, খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিক, ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক ও পথচারীদের জন্য ঝুঁকি বেশি।
ঢাকার বায়ুমান উন্নত করতে নিয়মিত পানি ছিটানো, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, খোলা ট্রাকে বালু-সিমেন্ট পরিবহন বন্ধ করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা পরিষ্কার রাখা, আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করা এবং শিল্পকারখানার নির্গমন তদারকি জরুরি। শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে ঢাকার বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব নয়-এটি এখন নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ নীতি ও জনস্বাস্থ্যের বড় সংকট।