রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নরসহ ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা মিলেছে

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নরসহ ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা মিলেছে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান-সহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

দীর্ঘ কয়েক বছরের তদন্ত শেষে সিআইডি মামলার খসড়া অভিযোগপত্র বা চার্জশিট প্রস্তুত করেছে। প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার এই বিশাল তদন্ত প্রতিবেদন বর্তমানে চূড়ান্ত আইনি মতামতের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দেশের অন্যতম বড় সাইবারভিত্তিক আর্থিক জালিয়াতির ঘটনাটি নিয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পর এই খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে।

 

কী ঘটেছিল ২০১৬ সালের সেই ঘটনায়?

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে অবস্থিত Federal Reserve Bank of New York-এ থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরির চেষ্টা চালায় আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্র।

 

এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার সফলভাবে ফিলিপাইনের RCBC-এর চারটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। বাকি ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশনায় একটি বানান ভুল থাকায় সেই লেনদেনটি আটকে যায় এবং অর্থ চুরি ব্যর্থ হয়। পরে দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফিলিপাইন থেকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

 

মামলার তদন্ত ও চার্জশিট

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন উপ-পরিচালক (হিসাব ও বাজেটিং) জোবায়ের বিন হুদা। পরে মামলাটির তদন্তভার সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

 

তদন্ত চলাকালে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যাংক কর্মকর্তা, প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খসড়া অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের আইনি পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হবে না।

 

বাজেয়াপ্ত ৮১ মিলিয়ন ডলার ফেরানোর আশা

এর আগে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি Md. Sibgat Ullah জানিয়েছিলেন, ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে থাকা ৮১ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওই অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চার্জশিট?

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা শুধু দেশের আর্থিক খাত নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সাইবার ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছিল।

 

এখন সাবেক গভর্নরসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসায় মামলাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। চার্জশিট চূড়ান্ত হলে দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

প্রায় এক দশক ধরে আলোচিত এই মামলার তদন্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দায় নির্ধারণ, বিচার প্রক্রিয়া এবং চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে নতুন অগ্রগতির দিকে নজর থাকবে দেশবাসীর।


সম্পর্কিত নিউজ