{{ news.section.title }}
নবম পে স্কেলের খসড়া চূড়ান্ত: বেতন, ভাতা ও পেনশনে আসছে বড় পরিবর্তন
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আসতে যাচ্ছে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে স্কেলের রূপরেখা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় মূল বেতন বৃদ্ধি, পেনশন পুনর্নির্ধারণ, ভাতা বৃদ্ধি এবং নতুন কিছু সুবিধা যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে গেজেট প্রকাশের পর আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন শুরু হবে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বেতন কমিশনের সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পর্যালোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত কাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে একবারে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিবর্তে তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এতে সরকারি ব্যয়ের ওপর হঠাৎ চাপ না পড়ে ধীরে ধীরে নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
মূল বেতন বাড়তে পারে ৫০ শতাংশ
প্রস্তাবিত কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বা বেসিক বেতন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধির ফলে সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বর্তমানে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী তা বেড়ে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকায় উন্নীত হতে পারে। একইভাবে দ্বিতীয় থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত সব পর্যায়ের কর্মকর্তার বেতন নতুন হারে পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই হারে বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা কর্মচারীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য বাড়তি সুবিধার আলোচনা
সূত্র জানায়, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য আরও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব গ্রেডের কর্মচারীদের বেসিক বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব আলোচনায় এলেও চূড়ান্ত খসড়ায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় অতিরিক্ত কিছু আর্থিক সুবিধা রাখার চিন্তা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈশাখী ভাতা ও টিফিন ভাতায় বড় পরিবর্তন
নতুন পে স্কেলে বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে। এর মধ্যে বৈশাখী ভাতা বর্তমান মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। বাস্তবায়ন হলে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সরকারি চাকরিজীবীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পাবেন। এ ছাড়া ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা মাসিক ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় এ ভাতা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাবে। মাঠপর্যায়ের কর্মচারী এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য এই সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শিক্ষা ভাতাও বাড়ছে
সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়ের চাপ কমাতে শিক্ষা ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে কর্মচারীরা মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা শিক্ষা ভাতা পেলেও নতুন কাঠামোতে তা ২ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা খাতে ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ভাতা পুনর্নির্ধারণ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
পেনশনভোগীদের জন্যও সুখবর
নতুন পে স্কেলে শুধু কর্মরত চাকরিজীবীরাই নয়, পেনশনভোগীরাও সুবিধা পেতে পারেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, যাদের মাসিক পেনশন ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে, তাদের পেনশন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হতে পারে। অন্যদিকে, ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। পেনশনভোগীদের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: দেশে স্বর্ণ ও রুপার আজকের বাজারদর কত?
জুলাই থেকে কার্যকর, মিলতে পারে বকেয়াও
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর ধরা হবে ১ জুলাই থেকে। ফলে গেজেট প্রকাশের পর সরকারি চাকরিজীবীরা বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন-ভাতা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এ কারণে চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে স্কেল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
কেন প্রয়োজন হলো নতুন পে স্কেল?
বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর গত ১১ বছরে খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহনসহ প্রায় সব খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও কমে গেছে।
এই বাস্তবতায় নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে বেতন ও ভাতা পুনর্নির্ধারণকে সময়ের দাবি হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিকে নতুন কাঠামোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার পর নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন সবার নজর গেজেট প্রকাশ এবং চূড়ান্ত ঘোষণার দিকে।